তোমায় ভালোবাসা যেন গভীর আতিথেয়তাযেন জ্বরের ঘোরে মাঝরাতে জেগে ওঠাআর জলের কলে মুখ ডুবিয়ে দেওয়া।যেন প্রেরকের ঠিকানাবিহীন উপহারের বড় একটা প্যাকেট খোলাসাগ্রহে, আনন্দে, সাবধানতায়।তোমায় ভালোবাসা যেন সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রথমবারের মতো উড়োজাহাজে যাওয়া,কোমলভাবে সন্ধ্যার আলো যেমন ইস্তাম্বুলের ওপর পড়ে।তোমায় ভালোবাসা যেন বলা—আমি জীবিত আছি।(নাজিম হিকমত/ অনুবাদ: লেখক)

মস্কোতে এসেও আমি জানতাম না নাজিম হিকমতের সমাধি মস্কোর কোথায়। নভোদেভিচি সিমেট্রিতে যাচ্ছিলাম পুরোনো গির্জা আর তার আশপাশের সমাধি দেখতে, যেখানে কিছু বিখ্যাত মানুষ ঘুমিয়ে আছেন। এ শহরের সবকিছু রাশিয়ান ভাষায় লেখা। তাই আমি হোটেল থেকে রওনা দেওয়ার আগে দেখছিলাম আর কার কার সমাধি এখানে আছে। লম্বা লিস্ট দেখতে দেখতে চোখ আটকে গেল একটা নামে। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না। সত্যিই নাজিম হিকমত এখানে থাকেন! সত্যিই?

নাজিম হিকমত মস্কোতেই আছেন জানতাম, তাই বলে এত তাড়াতাড়ি দেখা হবে? কিন্তু আমি তো সবার সঙ্গে তাঁকে দেখতে চাই না। আমি চাই একদমই আলাদাভাবে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। জেলখানায় যেমন তিনি একা ছিলেন, তেমনি একা দেখতে চাই আমি তাঁকে। এত ভিড়, কোলাহলে কীভাবে তাঁর সঙ্গে দেখা হবে! আর এত তাড়াতাড়ি আমি প্রস্তুত নই।

সিমেট্রিতে গিয়ে বড় বড় গাছ আর বড় বড় মানুষের সারি সারি সমাধি দেখে খেই হারিয়ে ফেললাম। সব সমাধির নামফলক যথারীতি রাশিয়ান ভাষায় লেখা। সুনসান নীরব চারদিক, আমি ছাড়া অন্য কেউ নেই। ২ হাজার ৬০০ সমাধির মধ্যে কে দেখিয়ে দেবে তাঁরটি?

আমি হাল ছাড়িনি। প্রথমে একটা একটা করে সমাধি দেখতে লাগলাম। সকাল থেকে দুপুর হয়ে গেল, কিন্তু তাঁকে খুঁজে পেলাম না। কত মানুষ ভালোবেসে প্রিয়জনের সমাধিতে কত রঙের যে ফুল রেখে গেছে। আমিও সকাল থেকে একটা লাল গোলাপ হাতে নিয়ে ঘুরছি। কে দেখিয়ে দেবে আমার প্রিয়তম কবির সমাধি?

সিমেট্রির একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, রাশিয়ান ভাষায় কী যে বলল বুঝলাম না। অনেক খুঁজে, না পেয়ে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আমি সেমিট্রির মাঝখানের খোলা চত্বরে চলে এলাম।

আকাশের মন ভারী হয়েছে, এই ঝরে পড়ল বলে। আমি পুরোনো দিনের মানুষ, আমার পুরোনো মানুষ খুঁজে বেড়াই। থমথমে আকাশ দেখে মনে হলো, কবি কি বেজার আজ? নাকি প্রিয় কিছু খুঁজছেন?

আমি ফিসফিস করে বলতে থাকি, কিছু না পেয়ে, তাঁকে না দেখে, হাজার হাজার মাইল দূরে থাকলেও যে ভালোবাসা আরও গাঢ় হয়, তা আপনি সবাইকে শিখিয়ে গেছেন আর আমাকে শিখিয়েছেন বিচ্ছেদ ভালোবাসতে।

নাজিম হিকমতের একেকটা কবিতার লাইন আমাকে একেকটা আলাদা জীবন দান করেছে। আমি কী করে যে তাঁর সামনে যাই! তাঁর প্রিয় কে জানি না, আমার প্রিয়তম তিনি। আমার ওই পাড়ের প্রেম তিনি, নাড়িয়ে দেওয়া প্রথম প্রেম!

আর ঠিক খোলা চত্বরের এক পাশে, ঠিক এখানেই আমি খুঁজে পেলাম আমার বিচ্ছেদের কবিকে। বিচ্ছেদ আর বাদল আমার কাছে পরিপূরক মনে হয়। না হলে এমন বাদল দিনে কেনই বা তাঁর কাছে আসতে হবে? এ শহরে কত দিন এমনিতেই কেটেছে, তাঁকে না দেখে, তৃষ্ণা না মিটিয়ে।

এখন অনেক খুঁজে তিনি যখন একেবারে সামনে, আমি পাথরের মূর্তি বনে গেলাম। পা নড়ছে না। একটু দূর থেকে দেখছি তাঁর সমাধির উঁচু ফলক। কালো ফলকে তাঁর নামটুকুই পড়তে পারলাম। নিচে ভক্তরা রেখে গেছে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল। এত ফুলের চাপে কেমন লাগছে তাঁর? প্রতিটি অনুভূতি অক্ষরের লুকোচুরিতে লিখে গেছেন। এখন তিনি কি কিছু লিখছেন আকাশে আকাশে, হাওয়ায় হাওয়ায়!

নাজিম হিকমত বলেছিলেন, ‘বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর।’ তাই যদি সত্যি হয় তাহলে এত শোক আকাশ থেকে উছলে পড়ছে কেন হে প্রিয়তম কবি!

নাজিম হিকমতের জন্ম আজ থেকে ঠিক ১২৪ বছর আগে ১৯০২ সালের ১৫ জানুয়ারি গ্রিসের সালোনিকি শহরে। তখন গ্রিসের একটা অংশ অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। নাজিম হিকমতের বাবা ছিলেন তুর্কি আর মা জার্মান। পরিবার ছিল শিল্প-সাহিত্যের সমঝদার, ধারক ও বাহক। ১৩ বছর বয়সে নাজিম লিখে ফেলেন প্রথম কবিতা। মেধাবী নাজিম হিকমত বিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে নেভাল স্কুলে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর যোগ দেন নৌবাহিনীতে। অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে বেশি দিন কাজ করতে পারেননি। এর মধ্যে মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতার বই। ১৯ বছর বয়সে পালিয়ে চলে গেলেন আনাতোলিয়া। সেখানে তখন অটোমান সাম্রাজ্য পতনের জোরদার আন্দোলন চলছে। নাজিমের বিদ্রোহী রক্ত টগবগিয়ে উঠল। বিদ্রোহে যোগদানের পাশাপাশি লিখতে থাকলেন একের পর এক কবিতা। এর দুই বছর পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে নাজিম চলে গেলেন মস্কো। এই কোমল মনের বিদ্রোহী কবির খুব ইচ্ছা বিপ্লব–পরবর্তী সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন কাছে থেকে দেখার। মস্কোয় তিনি সময় নষ্ট করেননি, ভর্তি হয়ে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বন্ধুত্ব হলো মায়োকভস্কি ও বিখ্যাত রুশ নাট্যকারদের সঙ্গে। লেলিনের মতাদর্শ সম্পর্কেও ধারণা হলো।

১৯২৪ সালে ফিরে যান নিজ দেশ তুরস্কে। সমাজতন্ত্রে যে নতুন পথের দিশা তিনি পেয়েছেন, তা তুরস্কের সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেবেন, এমনই তাঁর ইচ্ছা। কাজ শুরু করলেন একটি বামপন্থী পত্রিকায়। কিন্তু পড়তে হলো কামাল আতাতুর্ক সরকারের রোষানলে। ১৯৩৩ সালে গ্রেপ্তার করে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো কারাগারে। পর র কয়েকটি মামলার আসামি করা হলো। তাঁর অপরাধ, তিনি দেশের মানুষকে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের নামে বিভ্রান্ত করছেন এবং সরকারকে অপদস্থ করছেন। বুরসা জেলে বসে ‘জেলখানার চিঠি’ কবিতায় লিখেছিলেন:

মৃত্যু—একটি দেহ দড়িতে ঝুলছেআমার মন এমন মৃত্যু মেনে নেয়নি।কিন্তুতুমি বাজি রেখে বলতে পারোযদি কোনো অভাগার মাকড়সার মতো কালো হাতআমার গলায় ফাঁস পরায়তারা নাজিমের নীল চোখে বৃথা ভয় খুঁজে বেড়াবে।আমার শেষ ভোরেআমি আমার বন্ধুদের আর তোমায় দেখবআর আমি সমাধিতে যাবএকটি অসমাপ্ত গানের আক্ষেপ নিয়ে।

১৯৩৫ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন নাজিম হিকমত। আবারও বিভিন্ন অপরাধ দেখিয়ে তাঁকে বন্দী করা হলো ১৯৩৮ সালে। মূলত তাঁর অপরাধ একটাই, তিনি সমাজতান্ত্রিক দেশ চেয়েছিলেন, পুঁজিবাদকে শেষ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত নাজিম হিকমতের নয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। দেশে-বিদেশে তাঁর পরিচিতি বাড়ে।

১৯৩৮ সালে বন্দী করার পর কঠিন কঠিন আইন দেখিয়ে তাঁকে কারাগারে আটকে রাখা হয় টানা ১২ বছর। তত দিনে তিনি সাধারণ জনগণের প্রিয় কবি হয়ে গেছেন। যে জেলখানায় তাঁকে রাখা হয় তার সামনে জনগণ অবস্থান ধর্মঘট করে। জনগণকে সামাল দিতে না পেরে সরকার গোপনে তাঁকে দেশের বিভিন্ন কারাগারে স্থানান্তরিত করে। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে জনগণ টের পেয়ে যায় এবং তাঁর মুক্তির জন্য কারাগারের সামনে বিক্ষোভ করে। আঙ্কারা, চাঙ্কিরি, বুরসা, ইস্তাম্বুলের জেলে তাঁকে রাখা হয় ১৯৫০ সাল পর্যন্ত।

সারা বিশ্বে তখন নাজিম হিকমতের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু হয়। পাবলো পিকাসো, আলব্যের কামু, জাঁ পল সার্ত্রে নিজ দেশে নাজিম হিকমতের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। একই সময় জেলখানায় নাজিম হিকমত অনশন ধর্মঘট শুরু করেন, যা শোনামাত্র তাঁর মা এবং তুরস্কের অন্য লেখকদের কয়েকজন অনশন ধর্মঘট করেন। এসব চাপে পড়ে তুরস্ক সরকার নাজিম হিকমতকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়।

একই বছর, ১৯৫০ সালে নাজিম হিকমত নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।

১৯৫১ সালের জুন মাসে নাজিম রাশিয়ায় পালিয়ে যান এবং পরের মাসে তুরস্ক সরকার তাঁর তুর্কি নাগরিকত্ব বাতিল করে। রাশিয়ায় বসবাসকালে তিনি নিজ ভূমি তুরস্কের মানুষ, গ্রাম, শহর নিয়ে কবিতা লিখেছেন। একমুহূর্তের জন্যও ভুলে থাকতে পারেননি নিজ মাতৃভূমিকে। এই আশায় বেঁচে ছিলেন, কোনো একদিন নিজ ভূমিতে তিনি ফিরতে পারবেন।

১৯৬৩ সালের ৩ জুন, সকাল সাড়ে ছয়টা নাগাদ তিনি মস্কোর শহরতলির বাড়ির দরজায় গিয়েছিলেন খবরের কাগজ মাটি থেকে তুলে আনতে। নিচু হতেই হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। তিনি আর উঠতে পারলেন না। তাঁর ইচ্ছা ছিল তাঁকে যেন তুরস্কের আনাতোলিয়ায় সমাহিত করা হয়, কিন্তু সেখানে তখন তাঁর প্রবেশ নিষেধ। তাই মস্কোর নভোদেভিচি সেমিট্রিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

আমি নিচু হয়ে বসে আছি নাজিম হিকমতের সমাধির সামনে। কাঁপা কাঁপা হাতে একটিমাত্র গোলাপ নিবেদন করেছি। তাঁর লেখা সব কবিতা আমার মাথার ভেতর উড়ে বেড়াচ্ছে। এই বাদল দিনে কবিতাগুলো বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে আমাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে।

মৃত্যুর এক বছর আগে তিনি লিখেছিলেন ‘আমি জানতাম না আমি ভালোবাসি’ কবিতাটি:

১৯৬২ সালের ২৮শে মার্চআমি প্রাগ-বার্লিন ট্রেনের জানালার কাছে বসে আছিধীরে ধীরে রাত নামছেরাত আমার ভালো লাগে আমি জানতাম না,একটা ক্লান্ত পাখির মতো ভেজা মাটিতে রাতের মিলিয়ে যাওয়াক্লান্ত পাখির সাথে রাতের আগমনের তুলনা দিতে যদিও আমার ভালো লাগে না।আমি জানতাম না আমি এই পৃথিবীকে ভালোবেসেছিযে পৃথিবীর জন্য কিছু করেনি সে কি ভালোবাসতে পারে!আমি পৃথিবীর জন্য কিছুই করিনিএটা নিশ্চয়ই আমার কামনাবর্জিত প্রেম।এখানে আমি নদীকে পুরোটা সময় ভালোবেসেছিএ রকম গতিহীনভাবে পেঁচিয়ে পাহাড়ের কোনায় নেমে পড়ছেইউরোপের পাহাড়গুলো মাথায় প্রাসাদের মুকুট পরে থাকেঅথবা যত দূর চোখ যায় তত দূর এমনভাবেই লম্বা বয়ে গেছেআমি জানি তুমি একবারও এই নদীতে স্নান করতে নামোনিআমি জানি নদীটা নতুন সুন্দর দিন দেখাবেতুমি কখনোই তা দেখবে নাআমি জানি আমরা একটা ঘোড়ার চেয়ে সামান্য বেশি আয়ু পাবতবে একটা কাকের চেয়ে বেশি নয়আমি জানি এসব মানুষকে বিব্রত করেছেএবং বিব্রত করবে আমার চলে যাওয়ার পরওআমি জানি এসব আগে হাজারবার বলা হয়েছে এবং বলা হবে আমি চলে গেলে।আমি জানতাম না আমি আকাশ ভালোবাসিমেঘলা অথবা রৌদ্রজ্জ্বল।আন্দ্রেই যে নীল বইটি বোরোদিনোতে পড়েছিলজেলখানায় আমি ওয়ার অ্যান্ড পিস-এর দুটো খণ্ডই তুর্কি ভাষায় অনুবাদ করেছিআমি মানুষের কথা শুনতে পাইনীল বই থেকে নয়, সামনের আঙিনা থেকে।প্রহরীরা কাকে যেন আবার মারছে।আমি জানতাম না আমি গাছপালা ভালোবাসিমস্কোর কাছে পেরেদেলকিনোর শূন্য তটতারা শীতকালে আমার কাছে আসে মহান এবং বিনয়ী বেশেতটগুলো রাশিয়ার যেমনপপলার গাছগুলো তেমন তুর্কিরইজমিরের পপলার গাছগুলো পত্রহীন হয়ে যাচ্ছেতারা আমাকে ধারালো ছুরি নামে ডাকেতরুণ গাছের প্রেমিকের মতো।১৯২০ সালে আমি আকাশের সমান উঁচু প্রাসাদের দিকে তাকিয়েইলগাস বনের পাইনগাছে একটা এমব্রয়ডারি করা রুমাল বেঁধে এসেছিলামভাগ্যবান হওয়ার আশায়।আমি কখনোই জানতাম না আমি পথকে ভালোবাসিএমনকি কালো পিচঢালা পথকেও।ভেরা গাড়ি চালাচ্ছেআমরা মস্কো থেকে ক্রিমিয়ার পথেককতেবেলে যাকে তুর্কি ভাষায় বলা হয় গোকতেপেইলি (নীল পাহাড়)আমরা দুজন একটা বন্ধ বাক্সের ভেতরেজগতের সবকিছু ভেসে যাচ্ছে আমাদের পাশ দিয়েদূরে এবং নিঃশব্দেআমার জীবনে আমি কখনোই কারও এত কাছে আসিনি।ডাকাতরা আমাকে আটকাল বোলু আর গেরেদের মাঝে লাল রঙের পথেআমার তখন আঠারোআমার জীবন ছাড়া গাড়িতে নেওয়ার মতো আর কিছুই ছিল নাআঠারো বছর বয়সে আমরা জীবনকে মোটেই মূল্য দিই না।আমি এসব আগে কোথাও লিখেছিকাদাময় একটা পথ পেরিয়ে মঞ্চনাটক দেখতে যাচ্ছিরমজান মসের রাতএকটা লন্ঠন পথ দেখাচ্ছেহয়তোবা কখনোই আগে এমন হয়নিহয়তোবা আমি কোথাও পড়েছি যে আট বছরের একটা ছেলে মঞ্চনাটক দেখতে যাচ্ছেরমজানের এক রাতে দাদার হাত ধরেদাদার মাথায় ফেজ টুপি আর গায়ে পুরু কলার দেওয়া পশমের কোটআর লন্ঠনটি কাজের লোকের হাতে।আর আমি খুশিতে আত্মহারা হতে পারি নাফুলের কথা মনে পড়ে কোনো কারণেপপি, ক্যাকটাস, জংকুইলকোদিকোই–এর জংকুইল বাগান, ইস্তাম্বুলআমি মারিকাকে প্রথম চুম্বন করেছিলামতার নিশ্বাসে তাজা বাদামের সুগন্ধ ছিলআমার তখন সতেরোআমার হৃদয় নাগরদোলায় চড়ে আকাশ ছুঁল।আমি জানতাম না আমি ফুল ভালোবাসিবন্ধুরা আমায় তিনটি কারনেশন ফুল পাঠিয়েছিল, জেলখানায়।আমার হঠাৎ তারাদের কথা মনে হলোআমি তাদেরও ভালোবাসিআমি মাটিতে শুয়ে তাদের দেখিবা আমি তাদের পাশাপাশি উড়ে বেড়াইমহাকাশচারীদের কাছে আমার একটা প্রশ্ন আছে,আকাশের তারা কি অনেক বড়তারা কি দেখতে কালো ভেলভেট চাদরের ওপরে বড় কোনো ঝলমলে রত্নের মতোনাকি কমলালেবুর ওপর অ্যাপ্রিকটের মতো?তোমরা কি গর্ববোধ করেছ তারাদের কাছাকাছি গিয়ে?আমি অগোনেক ম্যাগাজিনে নক্ষত্রপুঞ্জের রঙিন ছবি দেখেছিএখন মনঃক্ষুণ্ন হয়ো না আমার কমরেডআমরা কি অবয়বহীন বলতে পারি বা বিমূর্তসেসব দেখতে তো আঁকা ছবির মতোআরও বলা যায় সেগুলোর অবয়ব আছে এবং মূর্তনক্ষত্রপুঞ্জ দেখে আমি বিচলিত হয়েছিআমাদের জন্য সেগুলো কোনো কিছু আঁকড়ে ধরার অন্তহীন আকাঙ্ক্ষানক্ষত্র দেখে আমার মৃত্যুর কথা মনে আসেএবং ব্যথিত না হয়েআমি কখনোই জানতাম না আমি নক্ষত্রবীথিকে ভালোবেসেছি।তুষার আমার চোখের সামনে ঝরতে থাকেভারী তুষারপাত বা হালকা ঝিরিঝিরি উড়তে থাকাআমি জানতাম না তুষার আমার ভালো লাগে।আমি কখনোই জানতাম না সূর্যকে ভালোবেসেছিএমনকি এখনকার মতো চেরি লাল রঙে যখন অস্ত যাচ্ছেইস্তাম্বুলেও সূর্য ছবির রঙের মতো রঙে অস্ত যায়কিন্তু তুমি প্রকৃতির রঙের ছবি সেভাবে আঁকতে পারবে না।আমি জানতাম না আমি সমুদ্র ভালোবেসেছিএকমাত্র আজোভের সমুদ্র ছাড়া।মেঘের প্রতি আমার ভালোবাসার কথা আমি একেবারেই জানতাম নাআমি মেঘের ওপরে বা নিচে থাকি না কেনমেঘকে অতিকায় বা পশমে আবৃত পশুর মতো দেখাক না কেন।চাঁদের আলো যত সাধারণ বা অলসভাবে জগতে পড়ুক না কেনআমাকে শিহরিত করেছে।আমি জানতাম না আমার বৃষ্টি ভালো লাগেবৃষ্টি সূক্ষ্ম জালের মতো পড়ুক বাঝমঝম করে জানালার কাচেআমার হৃদয় আমাকে সেই সূক্ষ্ম জালে ছেড়ে দেয়বা একটি বিন্দুর মাঝে আটকে দেয়আর আমাকে নিয়ে যায় অজানা দেশগুলোয়আমি জানতাম না আমি বৃষ্টি ভালোবেসেছি।কিন্তু কেনই বা আমি আচানক এত অনুরাগ আবিষ্কার করলামপ্রাগ-বার্লিন ট্রেনের জানালার কাছে বসেকারণ, আমি ষষ্ঠ সিগারেটটি ধরিয়েছিএকজন একাই আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারেকারণ, আমি অর্ধমৃতপেছনে ফেলে আসা মস্কো শহরে সেই একজনের কথা ভেবেতার চুল সোনালি, চোখের পাতা নীল।ট্রেনটা রাতের ঘন আঁধারে ঢুকে যাচ্ছেআমি জানতাম না নিকষ কালো রাত আমার ভালো লাগেইঞ্জিন থেকে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছেআমি জানতাম না আমার স্ফুলিঙ্গ পছন্দআমি জানতাম না আমার এত কিছু ভালো লাগেআর সে জন্য আমাকে ষাট বছর অবধি অপেক্ষা করতে হয়েছেএই উপলব্ধি হলো প্রাগ-বার্লিন ট্রেনের জানালার কাছে বসেপৃথিবীকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে দেখছিযেন এই যাত্রা না–ফেরার যাত্রা।

শুভ জন্মদিন প্রিয়তম কবি নাজিম হিকমত।

একটি লাল গোলাপ তাঁকে নিবেদন করলাম। পারলে সমর্পণ করতাম, কিন্তু তিনি কি জবাব দেবেন? লাল গোলাপটা যেমন একা, তেমনি তিনি একা, তেমনি আমাদের বিচ্ছেদ একা, বিচ্ছেদে পুড়ে যাওয়া মানুষ একা।