শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল থেকে রোগী গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় নেওয়ার পথে দুই দফায় অ্যাম্বুলেন্স রাস্তায় আটকে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরপর সেই রোগী ঢাকার হাসপাতালে পৌঁছার আগে মারা যান।

মারা যাওয়া ব্যক্তির নামা জমশেদ আলী ঢালী (৭০)। তাঁর বাড়ি ডামুড্যা উপজেলার কুতুবপুর এলাকায়। মঙ্গলবার বিকেলে তাঁর মৃত্যু হয়।

মারা যাওয়া ব্যক্তির স্বজনেরা অভিযোগ করেছেন, শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল এলাকার অ্যাম্বুলেন্স মালিক সুমন খানের নেতৃত্বে ৮-১০ জন লোক ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কের কোটাপাড়া ও জামতলায় দুই দফায় দেড় ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্সটি আটকে রাখেন। স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁরা মুক্ত হয়ে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে নেওয়ার পথে জমশেদ আলী বিকেল চারটার দিকে মারা যান।

জমশেদ আলীর পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, জমশেদ আলী গতকাল সকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর স্বজনেরা সকাল নয়টার দিকে তাঁকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে তাঁকে ভর্তি করা হয়। এরপর তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।

রোগীর স্বজনেরা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সদর হাসপাতাল চত্বর থেকে ছয় হাজার টাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্সে ভাড়া করেন। রোগীকে অ্যাম্বুলেন্স ওঠানোর পর ভাড়া আরও বেশি দাবি করা হয়। তখন স্বজনেরা তাঁদের পরিচিত একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়া করে ঢাকার দিকে রওনা হন। তখন স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চক্রের সদস্যরা দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কের কোটাপাড়া এলাকায় রোগীবহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি আটকে দেন। তাঁরা দাবি করতে থাকেন, স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স বাদ দিয়ে কেন বাইরের অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নেওয়া হচ্ছে।

এরপর স্থানীয় লোকজনের হস্তক্ষেপে ৪০ মিনিট পর অ্যাম্বুলেন্সটি ঢাকার উদ্দেশে আবার রওনা হয়। নড়িয়ার জামতলা এলাকায় যাওয়ার পর আবার ওই চক্র অ্যাম্বুলেন্সটি আটকে দেয়। ৫০ মিনিট বাগ্‌বিতণ্ডার পর অ্যাম্বুলেন্সটি ছাড়া হয়। তখন রোগীকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু করে। ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালের কাছাকাছি যাওয়ার পর রোগী মারা যান।

রাত আটটার দিকে জমশেদ আলীর লাশ নিয়ে তাঁর স্বজনেরা শরীয়তপুরের পালং মডেল থানায় আসেন। তাঁরা ঘটনাটি প্রথমে মৌখিকভাবে পুলিশকে জানান। এরপর পুলিশ লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন।

জমশেদ আলীর নাতি জোবায়ের হোসেন গতকাল রাত নয়টার দিকে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয় সিন্ডিকেটের অ্যাম্বুলেন্স না নেওয়ার কারণে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে আমাদের অ্যাম্বুলেন্সটি ঢাকা যাওয়ার পথে দুটি স্থানে দেড় ঘণ্টা আটকে রাখে। পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তা নিয়ে আমরা অসুস্থ নানাকে নিয়ে ঢাকার দিকে রওনা হই। ঢাকায় পৌঁছালেও হাসপাতালে পৌঁছাতে পারিনি, তার আগেই নানা মারা গেছেন।’

শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসক রাশেদ আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সকালের দিকে বয়স্ক এক লোক স্ট্রোকের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাঁর যাওয়ার পথে স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চালকদের সাথে কী ঘটেছিল, তা আমরা বলতে পারব না।’

এর আগে গত বছরের ১৪ আগস্ট শরীয়তপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ঢাকাগামী অ্যাম্বুলেন্সে রোগী ওঠানোর কারণে স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের সদস্যরা তা আটকে রাখেন। তখন ওই অ্যাম্বুলেন্সে এক নবজাতক শিশু মারা যায়। এ ঘটনায় নবজাতকের বাবা পালং মডেল থানায় ১৬ আগস্ট সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সাবেক চালক আবু তাহের, তাঁর ছেলে সবুজ দেওয়ানসহ চার ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা ৫-৬ জনকে আসামি করে মামলা করেন।

জানতে চাইলে অভিযুক্ত অ্যাম্বুলেন্সচালক সুমন খান মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকায় চলাচল করে এমন একটি অ্যাম্বুলেন্সে শরীয়তপুর হাসপাতালের রোগী ওঠানোর কারণ জানতে চেয়েছিলাম চালকের কাছে। এর বেশি কিছু নয়। আমি কোনো অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখিনি। এ অভিযোগ সঠিক নয়।’

শরীয়তপুর সদরের পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি মৌখিক হওয়ায় আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারিনি। মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাঁরা লিখিত অভিযোগ করবেন। অভিযোগ পেলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’