কোনো একদিন—ইস্তাম্বুলের ভাঙা সিঁড়িতে বসেবসফরাসের জল দেখব।রোমে হাঁটব সন্ধ্যের দিকে,যেখানে পাথর জানেকীভাবে সময় ধরে রাখতে হয়।আর দূরে কোথাওযাব লিসবন—রোদে পোড়া ট্রাম, নোনা হাওয়া,সন্ধ্যায় গিটার ভেজা ফাডো।ফাডোর সুরেদিনের ক্লান্তি ধীরে ধীরে নামবে।পরে মনে হলো,কিয়োটোর গলিপথও মন্দ নয়—চেরি ফুল ঝরে পড়ার শব্দ,চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠা ভোর।একদিন যাব মরক্কোর রাস্তায়,মসলার গন্ধে মাথা ঘুরবে,চোখ ভরে রং দেখব।হাভানার পুরোনো বারান্দায় দাঁড়িয়েহাসব অকারণে।এখন সেই হাসিটুকুও তুলে রাখি।বুকের ভেতর কেউ কোনো দিন জানবে নাকোন সুর রাতদুপুরেআমার ভেতর গুঞ্জন তুলেআমাকে তাড়িয়ে ফেরে...এই খাতার পাতায়সব পথের ঠিকানা লেখা নেই,শুধু কিছু নাম...জানি, একদিন যাব।সব দেনা শোধ হলে,সব হিসাব মিটে গেলেহালকা পায়ে বেরোব।সেদিন একা থাকব না।সেদিন একাকিত্বওপেছনে পড়ে থাকবে।

একদিন ভেবেছিলাম পাখির দেশে যাব—বৃষ্টিস্নাত টোকিও, কফিশপের প্যারিস,বরফে ঢাকা ভিয়েনা।কিন্তু যেখানেই যাই,আমি একা।আহা! একাকিত্বের কোনো পারপত্র লাগে না—সে সর্বত্র পৌঁছে যায়, সর্বময়।

হিমালয়ের কাছে গিয়েছিলাম—পাহাড় কিছু বলে না,না বলেও সে বোঝায়।আমি মনে মনে বলেছিলাম—ক্লান্ত শরীর,অবসন্ন মন,তবু বেঁচে আছে জীবনকারণ, এখনো না–বলা রয়ে গেছে অনেক কিছু।

টরন্টোর কোনো এক মেট্রোয়একজন অপরিচিত লোকআমার চোখে তাকিয়ে ছিল।সে কিছু বলেনি,তবু সেই তাকানোয় কী যে ছিল!কোনো কোনো তাকিয়ে থাকাদৃষ্টির চেয়েও গভীর হয়...

ছোটবেলায় একদিনপা ডুবিয়ে নেমেছিলাম শীতলক্ষ্যায়।সাঁতার না–জানা আমিডুবতে বসেছিলাম সবার অলক্ষ্যে।নদী যেন মায়ের মতনআমাকে কোলে তুলেপাড়ে দিয়ে গেল...ওই যে দূরে কুশিয়ারা ছোট ছোট গ্রামঘন নীলকণ্ঠ পাখির মতো বসে আছেএখনো আমার চোখে,আমার উননব্বইয়ের চোখে।আকাশে উড়ত শালিখ আর চড়ুই,হাতের তালুতে খেলত গঙ্গাফড়িং।আমার বয়স তখন উনিশ।নীলকণ্ঠ পাখি,তুমি কি চলে গেছ অন্য কোথাও,নাকি এখনো একা বসেসেই একই গান গাও?আমার নদীর কি এখনো ভরা যৌবনেনাকি আমার মতোই বিস্মৃতিপরায়ণ?গ্রামগুলো কি নগরের রূপ নিয়েছে,নাকি আমিই বদলে গেছিভেতরে–ভেতরে?আমি হাঁটছি গুলিস্তানের দিকে,বাসটা নিশ্চয়ই পেয়ে যাব,তবু হঠাৎ কী যেন হলো!মনটা ছুটে গেলকালীর বাজারের গলির ভেতর,যেখানে ছোট্ট আমি একদিন হারিয়ে গেছিলামনদী আর পাখির সঙ্গে,জন্মের স্মৃতি মিশে থাকা সেই সেই শহরে...কেউ জানবে না,আজ আমি চলে যাবচারারগোপ পাঁচ নম্বর ঘাটে।গল্পের মতো, হেঁটে হেঁটে।হয়তো আবার হারিয়ে গেছিনগরের ভিড়ে।হয়তো আবারআমাকে হারিয়ে আমাকেই খুঁজিএই দহনের কালে।শীতলক্ষ্যা,তুমি কি আগের মতোই আমার নদী,নাকি শুধু স্মৃতির জলে ভেসে যাও?এখনো ডুবে গেলেভাসিয়ে পাড়ে এনে দাও?আমি কেন আর খুঁজে পাই নাসেই বাসের ঠিকানা—যে বাসটা একদিনআমাকে ঠিকতোমার কাছেই নামিয়ে দিত!