আগামীকাল পয়লা বৈশাখ। এই উৎসবের সুযোগে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে প্রথমবারের মতো বৈশাখী মেলা আয়োজন করেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশন।

আজ দুপুর ১২টার দিকে টিকিট কেটে মেলায় প্রবেশ করতেই একজন মৃৎশিল্পীর স্টল চোখে পড়ল। কাঠের চাকায় বসানো যন্ত্রে নিপুণ হাতে তৈরি করছেন তিনি মাটির ফুলদানি, বাটি, প্লেটসহ নানা পণ্য। তাঁর কাজ দেখতে ভিড় জমিয়েছে কয়েকজন দর্শনার্থী।

সেই স্টল পেরিয়ে আরেকটি স্টলে পৌঁছালে দেখা গেল নকশা করা লাইটার, ক্লে পিন, টেপা পুতুল, কানের দুল, মদন, ভোগা, ফুলদানি ও মাটির হাঁড়িতে রং করা সরাচিত্র। সবই হাতে নকশা করা। এছাড়া পুঁতির আংটি ও ব্রেসলেটও রয়েছে। এসব পণ্যের দাম ৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক ছয় শিক্ষার্থীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই স্টলের নাম ‘দ্রি’। দ্রির উদ্যোক্তা মুহাম্মদ ঐশিক অদ্রি বলেন, “মাটির সঙ্গে দেশের সংস্কৃতির যে পুরোনো সম্পর্ক, তা আমরা এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।”

এই স্টলের ঠিক উল্টোদিকে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের স্টল। এখানে শাড়িসহ তাঁতের নানা পণ্য রয়েছে। সঙ্গে কাঠের চরকা, যা চালাচ্ছেন দুই নারী। মেলায় আরও রয়েছে হস্ত ও কারুশিল্প পণ্য, পাটজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, গয়না, চামড়াজাত পণ্য, ঐতিহ্যবাহী পণ্য, প্রস্তুত খাবার ও স্ট্রিট ফুড এবং সুগন্ধি ও লাইফস্টাইলের বিভিন্ন পণ্যের স্টল।

দর্শনার্থীদের জন্য বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ও বিনোদনমূলক আয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে নাগরদোলা, বানর খেলা, শিশুদের বিনোদন, বেলুন শুটিং, রণপা, আদিবাসী ও লোকজ নৃত্যসহ নানা অনুষ্ঠান। মেলার শেষ প্রান্তে সরাসরি ছবি আঁকার সুযোগ, যার জন্য ৫০০ টাকা দিতে হবে। ঠিক উল্টোদিকে টিয়া পাখির মাধ্যমে ভাগ্য গণনার স্টল।

শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে সাত দিনব্যাপী এই মেলা চলছে। মোট ১৫০টি স্টল রয়েছে। প্রবেশের জন্য প্রতিদিন ৩০ টাকা টিকিট কাটতে হয়। লাইনে না দাঁড়িয়ে এক্সপ্রেস টিকিট নিতে চাইলে ২০০ টাকা। ফ্রি পার্কিং সুবিধাও আছে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

মেলায় আরও যা রয়েছে

পয়লা বৈশাখে সকাল আটটা থেকে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হবে। প্রতিদিনের মতো সোহান আলী, প্রজন্ম (নৃত্য পরিবেশনা), ওশান মিউজিক ক্রু, নৃত্য ছায়া ও বাউল সংগীত পরিবেশনা থাকবে। ছবি তোলার জন্য ঐতিহ্যবাহী পালকি রয়েছে।

মেলার পাশে ২৫–৩০টি খাবারের দোকান, দেশি–বিদেশি নানা খাবার নিয়ে। আয়োজকেরা জানান, আজ সোমবার বেলা ২টা পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি দর্শনার্থী এসেছেন। ছুটির দিন হওয়ায় আগামীকাল ৩০ হাজারের বেশি আসবেন বলে আশা করছেন তারা।

কাঠের গৃহসজ্জা ও রান্নাঘরের পণ্য নিয়ে ট্রেন্ডিফার অংশ নিয়েছে। প্রায় ২১৩ ধরনের পণ্য তৈরি করে এই প্রতিষ্ঠান। ২৮ বছর বয়সী হাসিন রেজওয়ান ও মুহাম্মদ ইমরান চার বছর আগে এটি শুরু করেন। প্রথম দিনে প্রায় ৪০ হাজার টাকার বিক্রি হয়েছে।

প্রথমবার মেলায় অংশ নেওয়া হাসিন রেজওয়ান বলেন, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পণ্যগুলোই আনা হয়েছে। দাম ৪৫ টাকা থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।

বিদোরা গার্মেন্টস ফেলে দেওয়া ডেনিমের জুট দিয়ে ব্যাগ ও সিল্কের শাড়ি দিয়ে ওড়না তৈরি করে। পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড ও চীনে রপ্তানি হয়। আগের এসএমই মেলায় সাত দিনে সাড়ে চার লাখ টাকার বিক্রি হয়েছিল।

প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পরিচালনা নির্বাহী সাদিয়া আহসান বলেন, “এবারের মেলায় ছুটির দিন কম পড়েছে। এ ছাড়া মেলা সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত চলবে। তবু আশা করছি ভালো বিক্রি হবে।”

মেলায় বোরকা, বাচ্চাদের শাড়ি, টপস, ব্লাউজসহ নতুনত্ব বুটিকস ও হস্তশিল্পের পণ্য। কাঠ, প্লাস্টিক ও ভুট্টা দিয়ে গয়নাও এনেছে। সিলেটের চা নিয়ে টিংকারস টি অংশ নিয়েছে, মধুপুর, বালিশিরা ও খৈয়াছড়ার চা-বাগান থেকে সংগ্রহ করে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ক্রিয়াকারক অংশ নিয়েছে। এখান থেকে স্ক্রিপ্ট রাইটার, গ্রাফিকস ডিজাইন, ভিডিও ও ইভেন্ট প্ল্যানারসহ প্রায় ১০০ ধরনের সেবা পাওয়া যায়।

প্রায় ১২০ ধরনের সুগন্ধি নিয়ে সাইফুল ইসলাম অংশ নিয়েছেন। প্রথম দিনে লি উম্মাতি প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হয়েছে। সাইফুল ইসলাম বলেন, “প্রথম দিন মেলা শুরু হতে হতে বিকেল হয়েছে। আশা করছি আজকে ভালো বিক্রি হবে।”