দেশে গত দুই বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন কমতে থাকছে। বেশিরভাগ ছোট আকারের ইলিশই ধরা পড়ছে। গত জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ধরা ইলিশের গড় আকার ৩৪ সেন্টিমিটার বা সাড়ে ১৩ ইঞ্চির কাছাকাছি। এটি গত বছরের তুলনায় প্রায় এক ইঞ্চি কম।

ইলিশের দামও বছরের পর বছর বাড়ছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, ঢাকার বিভিন্ন বাজারে এখন ৪০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের প্রতি কেজি দাম দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা, যা গত বছরের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি। ২০২০ সালে ইলিশের সারা বছরের গড় দাম ছিল প্রতি কেজি ৭০১ টাকা।

ঢাকার কারওয়ান বাজারের মাছ বিক্রেতা মো. সুমন গতকাল রোববার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ৯০০ গ্রামের আশপাশের ইলিশের কেজি আড়াই হাজার টাকার মতো। আর ছোট ইলিশ (৪০০ গ্রাম) বিক্রি হচ্ছে দেড় হাজার টাকা কেজি।

ইলিশ দেশের জাতীয় মাছ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ২০২২ সালে মুক্তকণ্ঠকে বলেছিলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ১৯৭২ সালে নদ-নদীগুলোয় ব্যাপক ইলিশ পাওয়া গিয়েছিল। গ্রামের দরিদ্র মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রেখেছিল ইলিশ। এ কারণেই ইলিশকে জাতীয় মাছ নির্বাচন করা হয়।

নির্বিচার জাটকা, অর্থাৎ ছোট ইলিশ ধরাই উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ।
জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির মহাসচিব ইকবাল হোসেন

এখন সেই ইলিশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এক কেজি ইলিশের দাম পোশাকশ্রমিকদের ছয় দিনের ন্যূনতম মজুরির সমান। বাজারে বিক্রি হওয়া পাঙাশ মাছের (বড়টি ২৫০ টাকা কেজি) ১২ গুণ দাম ইলিশের।

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করছে। পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে মৎস্য অধিদপ্তর। ২০২১ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ২২৯ কোটি টাকার এ প্রকল্প শেষ হবে দুই মাস পর; কিন্তু উৎপাদন কমছে।

‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ নামের এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে মৎস্য সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়ন; অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো; জাটকা ও মা ইলিশ আহরণকারী ৩০ হাজার জেলে পরিবারের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা; জেলেদের মধ্যে ১০ জাল বিতরণ এবং প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। জেলে পরিবারকে সহায়তার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ আছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নকালেই ইলিশের উৎপাদন কমছে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে প্রকল্প হাতে নেওয়ার সময় ইলিশের বছরে উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার টন। পরের দুই অর্থবছর উৎপাদন কিছুটা বাড়ে। সর্বশেষ দুই অর্থবছর উৎপাদন কমেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ টনে (২০২২–২৩ অর্থবছরের চেয়ে ৭১ হাজার টন কম)।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জাটকা সংরক্ষণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থা ও খাদ্যসহায়তা শুরুর পর ইলিশের উৎপাদন বেড়েছিল। সমস্যাটা হলো ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম ছিল নদীকেন্দ্রিক। সাগরে কোনো কার্যক্রম নেই। তাঁর দাবি, সাগরে ইলিশের ওভারফিশিং (অতিরিক্ত আহরণ) হচ্ছে। অন্যদিকে নদীতে নাব্যতা সংকট বেড়েছে। আগের মতো নদীতে পানি নেই। ফলে ইলিশের যাত্রাপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সমুদ্রে ইলিশ রক্ষায় নিঝুম দ্বীপ, নাফ নদীসহ ছয়টি এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। সে অভয়াশ্রমগুলো কার্যকরভাবে রক্ষা করা যায়নি বলেও উল্লেখ করেন প্রকল্প পরিচালক।

মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, ২৮ হাজার আর্টিসেনাল ট্রলার (যেগুলো ৪০ মিটারের কম গভীরতায় মাছ ধরে) ও ২৬৮টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলার (৪০ মিটারের বেশি গভীরতায় যে ট্রলার মাছ ধরে) সমুদ্রে মাছ ধরে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারগুলো যখন গভীর সমুদ্রে মাছ পায় না, তখন তারা ৪০ মিটার গভীরতায় থাকা জাটকা ইলিশ ধরে। অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ করা যায়নি।

সমুদ্রে ইলিশ রক্ষায় নিঝুম দ্বীপ, নাফ নদীসহ ছয়টি এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। সে অভয়াশ্রমগুলো কার্যকরভাবে রক্ষা করা যায়নি বলেও উল্লেখ করেন প্রকল্প পরিচালক।

ছোট হচ্ছে ইলিশের আকার

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, তিন অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকার ছোট হচ্ছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকৃতি ছিল ১৪ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমেছে ১৩ দশমিক ৩৯ ইঞ্চিতে।

আকৃতিতে গড়ে সবচেয়ে ছোট ইলিশ ধরা পড়ে রাজশাহী জেলায় (১১ দশমিক ৪২ ইঞ্চি)। আর গড়ে বড় আকৃতির ইলিশ পাওয়া যায় কক্সবাজারে (১৫ দশমিক ১৬ ইঞ্চি)।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম গবেষণাটি করেছেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য প্ল্যাংকটন আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে, যার প্রভাব পড়ছে ইলিশের আকৃতিতেও। ইলিশ দ্রুত বড় হচ্ছে না। অন্যদিকে বড় হওয়ার আগেই জেলেদের জালে ধরা পড়ছে।

গবেষণায় বলা হয়, ইলিশের খাদ্যতালিকায় ২৭ প্রজাতির উদ্ভিদ কণা (জুপ্ল্যাংকটন) ও ১২ প্রজাতির প্রাণিকণা (ফাইটোপ্ল্যাংটন) রয়েছে। এসব প্ল্যাংকটনের পরিমাণ মেঘনা নদীতে ৬৮ শতাংশ কমেছে। এর বড় কারণ নদীদূষণ।

আকৃতিতে গড়ে সবচেয়ে ছোট ইলিশ ধরা পড়ে রাজশাহী জেলায় (১১ দশমিক ৪২ ইঞ্চি)। আর গড়ে বড় আকৃতির ইলিশ পাওয়া যায় কক্সবাজারে (১৫ দশমিক ১৬ ইঞ্চি)।

‘সবাই ইচ্ছেমতো জাটকা ধরে’

ইলিশ এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দ্রুত বড় হয়। একটি জাটকা এক বছর বাঁচলে সেটির আকৃতি ১১ দশমিক ৮১ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। একটি ইলিশ পাঁচ থেকে সাত বছর বেঁচে থাকলে ২২ দশমিক ৬৮ ইঞ্চি পর্যন্ত বড় হতে পারে।

জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির মহাসচিব ইকবাল হোসেন মনে করেন, নির্বিচার জাটকা, অর্থাৎ ছোট ইলিশ ধরাই উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সবাই ইচ্ছেমতো জাটকা ধরে। সাগরে বড় হওয়ার মতো ইলিশ খুব বেশি থাকে না। তিনি বলেন, সরকারের জাটকাবিরোধী অভিযানের মধ্যে এসব জাটকা ধরা হয়। ইলিশের প্রতি কারও দরদ আছে বলে মনে হয় না।