কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দী গ্রামে ঢুকলেই বাঁশির সুর ভেসে আসে বাতাসে। এই গ্রাম দুই শতকের ঐতিহ্য নিয়ে বংশপরম্পরায় বাঁশি তৈরি করে চলেছে। পয়লা বৈশাখ সামনে রেখে এখন কারিগররা ব্যস্ত, তাঁদের তৈরি বাঁশি দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছাচ্ছে।
শ্রীমদ্দী গ্রামের অন্তত ৪০টি পরিবার ১৪ ধরনের বাঁশি তৈরিতে নিয়োজিত। গ্রামের নারী-পুরুষ, এমনকি শিশুরাও এই কাজে হাত লাগান। পয়লা বৈশাখের জন্য এখন ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে ভিড় করছেন।
প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে, প্রায় ২০০ বছর আগে গ্রামের কোকিল দাস বৈরাগী ও দীনবন্ধু দাস বাঁশি তৈরি শুরু করেন। তাঁদের ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে যাতায়াত ছিল, সেখান থেকে প্রক্রিয়া শিখে এসে কাজ শুরু করেন। শুরুতে অল্প বাঁশি তৈরি করে নিজেরাই ফেরি করে বিক্রি করতেন। তাঁরা চমৎকার সুরে বাঁশি বাজাতেনও। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামবাসীরা শিখে বংশপরম্পরায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
গ্রামের যতীন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস (৭০) ও স্ত্রী রীনা রানী বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে বাঁশি তৈরি করছেন। যতীন্দ্র বিশ্বাস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “তাঁর বাবা ভগবান বিশ্বাস দাদা হরিচরণ বিশ্বাসের কাছ থেকে শিখেছেন। তাঁর (যতীন্দ্র) কাছ থেকে তাঁর তিন মেয়ে শিখেছেন। তাঁরা এখন স্নাতকে পড়ছেন। লেখাপড়া শেষ করে প্রয়োজনে তাঁরা এই কাজ করবেন। বর্তমানে বাঁশি তৈরির আয় দিয়েই তাঁর সংসার চলছে।” তিনি যোগ করেন, আগে বাঁশির বাজার অনেক ভালো ছিল। চৈত্র মাস এলেই ঢাকার চকবাজারের ব্যবসায়ীরা এসে বাঁশি কিনে নিয়ে যেতেন। এখন চাহিদা না বাড়লেও কদর তেমন কমেনি।
বাঁশির কারিগর আবুল কাশেম (৬০) বলেন, তিনি ৫০ বছর ধরে বাঁশি তৈরি করছেন। বাবা ও বড় ভাইয়ের কাজ থেকে শিখেছেন। তাঁর চার সন্তানও লেখাপড়ার পাশাপাশি এ কাজ শিখেছেন। লেখাপড়া শেষে ভালো চাকরি না পেলে এই কাজই করবেন। তিনি বাঁশি তৈরির পাশাপাশি অনলাইনে দেশ-বিদেশে বাঁশি বিক্রি করেন। তিনি ভালো বাঁশিও বাজাতে পারেন।
একটি বাঁশি তৈরিতে ১৩ থেকে ১৪টি ধাপ লাগে। মূলত মুলি বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় এটি, লম্বা হয় ১৩ থেকে ২০ ইঞ্চি পর্যন্ত। প্রথমে মুলি কেটে শুকানো হয়। তারপর বাঁশের ছাঁচ চেঁচে ফেলা হয়, তবে আড়বাঁশির ক্ষেত্রে হয় না। ছিদ্রের জন্য দাগ কাটা হয়। আড়বাঁশিতে কাদামাটি দিয়ে নকশা করে আগুনের ছেঁকা দেওয়া হয়, যাতে নকশা ফুটে ওঠে। ছিদ্রের জন্য চোখা শিক ব্যবহার হয়। পরে সিরিশ দিয়ে ঘষে মসৃণ করে রং-নকশা করা হয়। এরপর প্যাকেট করে বাজারজাত করা হয়।
শ্রীমদ্দীতে আড়বাঁশি, বেলুন বাঁশি, মুখ বাঁশি, সানাই বাঁশি, কেলেনেট বাঁশি, পাতা মুড়ালি বাঁশি, ছোট নাগ বাঁশি, বড় নাগ বাঁশি, পাখি বাঁশি, মোহন বাঁশি, তোতা বাঁশি, টিপেরা ফুলট বাঁশি, থ্রিপিস বাঁশি, টেলি বাঁশি তৈরি হয়। এগুলো ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, স্পেন, ইতালি সহ বিদেশেও যায়।
আবুল কাশেম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিদেশে মুখ বাঁশি ও আড়বাঁশির কদর বেশি। এই বাঁশিগুলো একেবারেই প্রাকৃতিক। দেশে চাহিদা বেশি মোহন বাঁশির। ঢাকার কিছু ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে অর্ডার নিয়ে নমুনা দেন, তাঁরা সে অনুযায়ী তৈরি করেন। সরকারি সহযোগিতা পেলে বাঁশি ব্যাপকভাবে বিদেশে পাঠানো সম্ভব।
গত শনিবার সকালে গ্রামে দেখা গেছে, বাড়ি বাড়িতে বাঁশি তৈরির কাজ চলছে। কেউ মুলি কাটছেন, কেউ ছিদ্র করছেন, কেউ ছেঁকা দিচ্ছেন, কেউ রং করছেন। শুধু জীবিকার জন্য নয়, মনের টানেও এ কাজ করেন।
প্রবীণ কারিগর অনিল বিশ্বাস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শ্রীমদ্দী গ্রামের অন্তত ৪০টি পরিবার বাঁশি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের সব বয়সের নারী, পুরুষ, শিশু—সবাই কোনো না কোনো ধাপে হাত লাগান।
শ্রীমদ্দীর বাঁশি ঢাকার চকবাজার ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেটসহ সারা দেশে যায়। ইউরোপের দেশেও পৌঁছায়। ধরনভেদে দাম ১০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা। চৈত্রে বৈশাখী মেলার জন্য ভিড় সবচেয়ে বেশি হয়।
নেত্রকোনার মদন উপজেলার ত্রিয়শ্রী গ্রামের ব্যবসায়ী রাজু মিয়া বলেন, ৪৩ বছর ধরে তিনি শ্রীমদ্দী থেকে বাঁশি কিনে বিক্রি করছেন। যুবকেরাই আসল গ্রাহক, বাচ্চারাও কেনে। ঢাকায় তাঁর দোকান আছে। বৈশাখী মেলার জন্য টানা ছয় দিন এখানে থেকে কিনছেন।
কারিগর রতন চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, দেশি-বিদেশি প্লাস্টিক খেলনার কারণে বাঁশির কদর কিছুটা কমেছে। তবু সারা দেশের ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যান। মেলা ও ওরসে বেশি বিক্রি হয়। বিদেশেও যাচ্ছে। গুণগত মান বাড়াতে ব্যাংক ঋণসহ সরকারি সহযোগিতা দরকার।
হোমনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহিদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দেশি ঐতিহ্য ধরে রাখতে শ্রীমদ্দী গ্রামের বাসিন্দাদের উৎসাহ দেওয়া উচিত। তাঁরা এলে ঋণের বিষয়ে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে ব্যাপারে আলোচনা করা হবে।






