২০১৮ সালের বহুল আলোচিত ‘রাতের নির্বাচন’-এর পর গঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। এই সংসদের অভ্যন্তরীণ জগত, কাঠামো, সংস্কৃতি এবং সীমাবদ্ধতা কাছাকাছি দেখার সৌভাগ্য কম লোকেরই হয়েছে। রুমিন ফারহানার সংসদের দিনগুলি: একাদশ সংসদে সাড়ে তিন বছর বইটি সেই অপ্রকাশিত দুনিয়াকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছে।

বিএনপির জন্য বরাদ্দ সাতটি আসনের বিপরীতে একমাত্র সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্যত্ব করেন রুমিন ফারহানা। এই সংক্ষিপ্ত অভিজ্ঞতাকে তিনি রূপায়িত করেছেন একটি স্মৃতিকথা-ভিত্তিক, তথ্যবহুল এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ গ্রন্থে। ফলে এটি কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়, একাদশ সংসদের কার্যপ্রণালির এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে।

বইটির বড় আকর্ষণ সংসদ ভবনের অন্দরমহলের চিত্রায়ন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের দপ্তর, লাইব্রেরি, ক্যানটিন, নামাজের স্থান—এসবের অবকাঠামোর বিবরণের পাশাপাশি তাদের ব্যবহারপদ্ধতি এবং আচরণগত সংস্কৃতিও তুলে ধরা হয়েছে। এই অংশগুলো পাঠককে সংসদের দৃশ্যমান কাঠামোর সঙ্গে অদৃশ্য মনোবিজ্ঞান বোঝাতে সহায়তা করে।

বইটির প্রকৃত শক্তি লেখকার সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে পর্যবেক্ষণে। তত্ত্বগতভাবে আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র হলেও বাস্তবে গঠনমূলক ও সমালোচনামূলক আলোচনার অভাব তিনি স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন। সরকারি সহায়তায় বিরোধী আসনে থাকা জাতীয় পার্টিকে তিনি কার্যত ‘মোসাহেব’ শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যারা সরকারের সমালোচনার বদলে অনেকবার সমর্থনের ভূমিকা পালন করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রকৃত বিরোধী কণ্ঠ হয়ে ওঠে বিএনপির অল্প কয়েক সদস্য। কিন্তু সেই কণ্ঠও ছিল নিয়ন্ত্রিত—সময় নির্ধারণ, বক্তব্য সীমিতকরণ এবং নিয়মের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে। লেখকের বর্ণনায় দেখা যায়, নির্ধারিত সময়ের এক মিনিটও বাড়ানো যেত না, বরং সেই সময় বাড়ানোর জন্য তাঁকে প্রায় লড়াই করতে হয়েছে। অথচ অন্যদের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ হয়নি, যা সংসদের অভ্যন্তরে বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়।

সমালোচনার এই চেষ্টার জবাবে লেখক যে প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছেন, তাও বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নীতিগত বা তথ্যভিত্তিক সমালোচনার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতাকে তিনি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সব মিলিয়ে সংসদের দিনগুলি শুধু একটি স্মৃতিকথা নয়, এটি বাংলাদেশের একাদশ সংসদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যাঁরা রাজনীতি নিয়ে ভাবেন, গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কিংবা সংসদীয় ব্যবস্থার ভেতরের গতিশীলতা বুঝতে চান, তাঁদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য।

বইটির আরেক উল্লেখযোগ্য দিক এর তথ্যনির্ভরতা। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে লেখক যে পরিমাণ গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ করেছেন, তা তাঁর বক্তব্যকে বিশ্লেষণাত্মক গভীরতা দিয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, দেশে ধনী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও দারিদ্র্য কমার হার কমে গেছে। উন্নয়ন বাজেট বণ্টনে বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট, বৈদেশিক ঋণের চাপ ইত্যাদি তিনি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছেন।

অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। বিপুল ব্যয়ের পরও সড়কের নিম্নমান, নির্মাণব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক তুলনায় ব্যয়ের অমিল—এসব পাঠককে ভাবিয়ে তোলে। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের উচ্চহার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং সামাজিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা—সব তথ্যসহ আলোচিত হয়েছে।

বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে স্বল্প বরাদ্দের কারণে প্রতি বছর বিপুল মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নামার বিষয়টি তিনি জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। শিক্ষা খাতের বাজেট হিসাবে ভিন্ন খাতের অর্থ যুক্ত করে প্রকৃত বরাদ্দ আড়ালের অভিযোগও উল্লেখযোগ্য।

দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রসঙ্গেও লেখক সরব। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ, কুইক রেন্টাল প্রকল্পের আর্থিক প্রভাব, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি—এসব সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছে। এতে বইটি সমালোচনামূলক রাজনৈতিক দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে লেখক বলেছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনে একক দলের চেয়ে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বেশি কার্যকর। ব্যক্তিপূজার রাজনীতির বিপদও তিনি সতর্ক করেছেন।

উপসংহারে লেখকের উপলব্ধি—সৎ, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব ছাড়া দেশের রাজনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি অসম্ভব। এটি বইটির বক্তব্যকে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়।

সব মিলিয়ে সংসদের দিনগুলি শুধু স্মৃতিকথা নয়, একাদশ সংসদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। রাজনীতি, গণতন্ত্র বা সংসদীয় ব্যবস্থা নিয়ে আগ্রহীদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। নতুন সংসদ সদস্যদের জন্য শিক্ষণীয় এবং ক্ষমতাসীনদের জন্য আত্মসমালোচনার আয়না হতে পারে।

সংসদের দিনগুলি: একাদশ সংসদে সাড়ে তিন বছর

রুমিন ফারহানা

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন

প্রকাশ: মার্চ ২০২৬

প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল

পৃষ্ঠা: ১৪৪

মূল্য: ৪০০ টাকা