আলোকচিত্র সময়ের নীরব সাক্ষী। প্রতিকৃতি ছবির খ্যাতি অর্জনকারী নাসির আলী মামুন এই শিল্পের মাধ্যমে সমকালীন বাংলা কবিতার দুই শীর্ষস্থানীয় কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের জীবন, সৃষ্টি এবং অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছেন।
৪ এপ্রিল ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে শুরু হয়েছে ‘ফটোজিয়াম: লাইফ অব পোয়েট্রি’ নামে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের তোলা কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের আলোকচিত্র প্রদর্শনী। তিনি স্বাধীনতার পর থেকেই এই দুই কবির জীবনের নানা মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরেছেন। এবার সেখান থেকে নির্বাচিত ৫৮টি ছবি নিয়ে প্রদর্শনী। কয়েকটি ছাড়া বাকি সব সাদাকালো। শেষ হবে ১৬ এপ্রিল। খোলা থাকবে প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
এই প্রদর্শনীতে নাসির আলী মামুন কবিদের শুধু প্রতিকৃতি দেখাননি, তাঁদের জীবনের বহুমুখী দিকও উন্মোচিত করেছেন। বিভিন্ন বয়সের ছবি, গেরস্তালি জীবনের অন্তরঙ্গ দৃশ্য, অফিসকর্ম, বিদেশযাত্রা বা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মুহূর্ত—সবই রয়েছে। ফলে এটি হয়ে উঠেছে দুই কবির জীবন ও সৃষ্টির এক নির্ভরযোগ্য দলিল, যেখানে দর্শকরা কাব্যচর্চার পাশাপাশি জীবনের বাস্তবতা অনুভব করতে পারবেন।
দর্শকরা দেখবেন দৈনিক বাংলা কার্যালয়ে কবি শামসুর রাহমান বসে আছেন তাঁর কক্ষে। ১৯৭৮ সালের কোনো এক দিনে। খোলা জানালা দিয়ে একফালি আলো এসে আলতো করে স্পর্শ করেছে তাঁর মাথাভরা ঢেউখেলানো কালো চুল, কপাল, চিবুক আর ঠোঁটের খানিকটা অংশ। পাশ থেকে তোলা ছবি। আলো-আঁধারির অনন্য মিশেলে কবির মুখ যেন হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত কবিতা।
অন্যদিকে ১৯৭৬ সালে কবি আল মাহমুদের একটি ছবি তুলেছিলেন নাসির আলী মামুন শিল্পকলা একাডেমিতে কবির কার্যালয়ে। সরু কালো বর্ডারের কলার আর বুকে কালো চেইন লাগানো সাদা টি–শার্ট পরে আছেন তারুণ্যদীপ্ত কবি। মুখে স্মিত হাসি। মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ক্যামেরার লেন্সের দিকে, যেন এক নিঃশব্দ পঙ্ক্তিমালা।
দেশের প্রধান এই দুই কবির একসঙ্গে বেশ কিছু ছবি রয়েছে। তখন তাঁরা বার্ধক্যে উপনীত। আল মাহমুদ শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত, আর শামসুর রাহমানের মাথায় কাশফুলের মতো পালিত কেশ।
একসময় এই দুই কবির মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। শীতল সম্পর্ক। বন্ধ কথাবার্তা। সেই দূরত্ব দূর করতে ২০০৪ সালে উদ্যোগ নেন নাসির আলী মামুন। পবিত্র রমজান মাসে শ্যামলীতে শামসুর রাহমানের বাসায় আল মাহমুদকে নিয়ে যাওয়ার সেই ঘটনা বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে আছে।
শামসুর রাহমান সহাস্যে উষ্ণ করমর্দনে আল মাহমুদকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে এসেছিলেন নিজের শয়নকক্ষে। সেখানে দুই কবি খুবই অন্তরঙ্গ পরিবেশে লম্বা সময় ধরে আড্ডা দিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেই মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করেছেন আলোকচিত্রী।
অনেক বছর থেকেই নাসির আলী মামুন দুই কবির ছবি তুলছিলেন। বাড়িতে, অফিসে, বাইরেসহ বিভিন্ন স্থানে। সেই সূত্রে কবিদের পরিবারের সঙ্গেও তাঁর হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। কবিদের পারিবারিক পরিবেশের ছবিতে তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও ছবি তুলেছিলেন তিনি।
একসময় বেলা গড়িয়ে ইফতারের সময় এলে একত্রে ইফতার করেছেন দুই কবি। এ সময়ের এক অসাধারণ ছবি ধরেছেন নাসির আলী মামুন। ঘরের মেঝেতে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়িয়েছেন আল মাহমুদ। আর বিছানায় ইফতারির থালা হাতে তাঁর দিক তাকিয়ে আছেন শামসুর রাহমান। প্রদর্শনীর অধিকাংশ সাদাকালো ছবির মধ্যে এই রঙিন ছবিটি যেন মুহূর্তটির আবেগকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।
অনেক বছর ধরে নাসির আলী মামুন দুই কবির ছবি তুলেছেন বাড়ি, অফিস, বাইরে—বিভিন্ন জায়গায়। এতে কবিদের পরিবারের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছে। পারিবারিক ছবিতে পরিবারের সদস্যদেরও ধরেছেন। প্রদর্শনীতে এমন কিছু ছবি রয়েছে। ছবির পাশাপাশি তাঁদের হাতে লেখা কবিতার পাণ্ডুলিপি সহ বেশ কিছু নিদর্শনও আছে।
শামসুর রাহমানের ছবিগুলোতে দেখা যাবে কবিতা লেখার মুহূর্ত, চুল আঁচড়ানো, মুখে সেভিংক্রিম মাখিয়ে খৌরকর্মের প্রস্তুতি, স্ত্রীর সঙ্গে পাশাপাশি বসে থাকা। কবি ওস্তাদ বাহাদুর খানের সরোদবাদন শোনা, রিকশায় পুরান ঢাকার রাস্তায়, শান্তিনিকেতনে—এমন অনেক দৃশ্য।
আল মাহমুদকে দেখা যাবে গ্রামে দেহাতি মানুষদের সঙ্গে, মমতাময়ী মায়ের নিবিড় সান্নিধ্যে, বই পড়া, কাব্যভাবনায় নিমগ্ন হয়ে থাকা, স্ত্রী ও নাতি–নাতনিদের সঙ্গে পারিবারিক পরিবেশে।
দর্শকরা আরও দেখবেন দুই কবি আমন্ত্রিত হয়ে শান্তিনিকেতনে। দাঁড়িয়ে আছেন ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজের ভাস্কর্যের সামনে। কোনো এক অনুষ্ঠানে পাশাপাশি দুই কবি। একসঙ্গে আহার করছেন, মেতে আছেন আড্ডায়—এমন আরও বেশ কিছু দৃশ্য রয়েছে, যা তাঁদের অন্তরঙ্গতা তুলে ধরবে।
আলোকচিত্র সময়কে ধরে রাখে। আর মানুষের হৃদয় ধরে রাখে স্মৃতি, অনুরাগ, ভালোবাসা। এ প্রদর্শনী শুধু দুই কবির জীবনচিত্র নয়, স্মৃতি, অনুরাগ ও ভালোবাসা মিলেমিশে যেন বাংলা কবিতার এক জীবন্ত ইতিহাস হয়ে উঠেছে। এর কথা দর্শকদের মনে অম্লান হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন।






