ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে তৃতীয় দফায় বাদ যাওয়া ৬১ লাখ ভোটারের ৬৫ শতাংশ মুসলিম। এই পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারীর মতো বিজেপি নেতারা এসআইআর শুরুর আগেই বলেছিলেন, ১ কোটি ২০ লাখের মতো ‘বেনোজল’ বের করা হবে। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ‘বাংলাদেশি সব ঘুষপেটিয়া’ ও রোহিঙ্গাদের বাদ দেওয়া হবে।
রাজ্যের প্রথম দফার ভোট গ্রহণের আগে দফায় দফায় বাতিল ও ছাঁটাইয়ের সংখ্যা জানানোর পর চূড়ান্ত তালিকায় দেখা যাচ্ছে, ৯১ লাখ মানুষ এবার ভোট দিতে পারছেন না। এঁরা সবাই মাস কয়েক আগে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন। নতুন করে ভোটার হয়েছেন মাত্র ১ লাখ ৯০ হাজারের মতো।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুসারে, ২০২৪ সালে মোট ভোটার ছিলেন ৭ কোটি ৬৬ লাখ ১০ হাজার ৬ জন। নিবিড় সংশোধন শুরু হওয়ার পর প্রথম ধাপে বাদ যায় ৫৮ লাখ ২০ হাজার ৮৯৯ জনের নাম।
# পশ্চিমবঙ্গে চূড়ান্ত তালিকায় ৯১ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। # সবচেয়ে বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে মুর্শিদাবাদে, যেখানকার জনসংখ্যার প্রায় ৬৭ শতাংশ মুসলিম। # ৩০ শতাংশ বা ২০ শতাংশ মুসলিম ভোটার থাকা ১১২ আসনের ১০৬টি গতবার জিতেছিল তৃণমূল।
কমিশনের দাবি, এদের মধ্যে কেউ মৃত, কেউ অন্যত্র চলে গেছেন, কারও নাম একাধিক স্থানে রয়েছে, কাউকে তাঁদের ঠিকানায় পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ভুয়া ভোটার।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফার চূড়ান্ত তালিকায় বাদ যায় আরও ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম। এরপর তৃতীয় ধাপে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যানসি’ বা যুক্তিপূর্ণ অসংগতি লক্ষ করে কমিশন বাদ দেয় আরও ৬১ লাখ। এখান থেকেই প্রবল বিতর্ক শুরু হয়।
যুক্তিপূর্ণ অসংগতি দেখা হয়েছে নাম ও পদবির বানানের ক্ষেত্রে। যেমন কারও পদবি বন্দ্যোপাধ্যায় বা মুখোপাধ্যায়, কিন্তু পুরোনো তালিকায় ব্যানার্জি বা মুখার্জি লেখা। নারীদের বিয়ের পর পদবি পরিবর্তনেও অসংগতি দেখা হয়েছে। মিজানুরের নামে এক জায়গায় ‘জে’, অন্য জায়গায় ‘জেড’। রহমানের বানানে এক নথিতে একরকম, অন্যটিতে ‘এ’ বেশি বা কম।
কমিশন জানিয়েছে, তৃতীয় দফায় বাদ যাওয়া ভোটারদের আইনি প্রক্রিয়ায় (অ্যাডজুডিকেশন) যেতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, সন্দেহের নিরসন না করতে পারলে বিচার বিভাগীয় ট্রাইব্যুনালে যাবেন। এর ফলে ৬১ লাখের মধ্যে ৩২ লাখ ৬৮ হাজার ১১৯ জন বৈধ, ২৭ লাখ ১৬ হাজার ৩৯৩ জন অবৈধ বলে প্রমাণিত হয়।
অর্থাৎ ২০২৪ সালে যারা ভোট দিয়েছিলেন, বছর দেড়েকের মধ্যে তাঁদের প্রায় ৯১ লাখ গায়েব। এদের মধ্যে মৃত, রাজ্য ত্যাগী, একাধিক জায়গায় নাম থাকা এবং অবৈধ ভোটার রয়েছেন। অবৈধরা ট্রাইব্যুনালে গিয়ে নাম ফিরিয়ে আনতে পারেন, তবে এবারের ভোটে অংশ নিতে পারবেন না।
এই প্রক্রিয়া নিয়ে বড় বিতর্ক। কমিশন যদি আরও সময় নিয়ে কাজ করত, তাহলে ২৭ লাখ মানুষ অনিশ্চিত থাকত না। আইন বলে দোষী ছাড়া পাওয়া ঠিক নয়, কিন্তু নিরপরাধ শাস্তি পাবে না এটাও দেখতে হবে। ভোটের পর যদি অনেকে ট্রাইব্যুনালে বৈধ প্রমাণিত হন, তাহলে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের দায় কমিশনের।
বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, বিজেপির সঙ্গে কমিশনের যোগসূত্র রয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের জবাবদিহিতে প্রশ্ন উঠেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ভোটে হারাতে না পেরে বিজেপি কমিশনকে দিয়ে গোড়ায় কোপ মারছে।
চূড়ান্ত তালিকায় দেখা যাচ্ছে, ৬১ লাখের ৬৫ শতাংশ মুসলিম। এসআইআরের পর ১২ শতাংশ অবৈধের মধ্যে ৫ শতাংশ মুসলিম। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুরে এটি স্পষ্ট। সবচেয়ে বেশি বাদ পড়েছে মুর্শিদাবাদে, যেখানে জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশ মুসলিম। সমশেরগঞ্জে ৭৪ হাজার ৭৭৫, লালগোলা, ভগবানগোলা, রঘুনাথগঞ্জ, ফারাক্কা, সুতি, জঙ্গিপুরে ৫৫ হাজার থেকে ৩৬ হাজার। মেটিয়াবুরুজে ৪০ হাজার, ভবানীপুরে ৫১ হাজার।
গতবার নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেড় হাজার ভোটে হারানো শুভেন্দু অধিকারী এবার ভবানীপুরে চ্যালেঞ্জার। অমিত শাহ রোড শো করেছেন, নরেন্দ্র মোদি আসবেন।
অধিকাংশ স্থানে মুসলিম ভোটার, যাদের তৃণমূলের প্রতি আনুগত্য। ২০২১ সালের বিধানসভায় ৩০ শতাংশ বা তার বেশি মুসলিম ভোটের ৮৯ আসনের ৮৭টি জিতেছিল তৃণমূল। ২০ শতাংশ বা তার বেশি মুসলিম ভোটারের ১১২ আসনের ১০৬টি জিতেছিল তৃণমূল।
মমতা বলেছেন, বিজেপির নির্দেশে কমিশন বেছে বেছে কোপ মেরেছে। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, চব্বিশ পরগনা, উত্তর দিনাজপুর, ভবানীপুর বরবাদ।
মতুয়া সম্প্রদায়ের হিন্দুদের নামও বাদ পড়ায় বিজেপিতে উদ্বেগ। নদীয়ার কৃষ্ণনগর, রানাঘাট, উত্তর চব্বিশ পরগনার গাইঘাটা, বনগাঁ, ঠাকুরনগরে প্রভাব পড়তে পারে।
এবারের লড়াই তৃণমূল-বিজেপির পাশাপাশি কমিশনের সঙ্গেও। জ্ঞানেশ কুমার প্রথম এমন ভূমিকায়। কমিশন জানায়নি কত ‘বাংলাদেশি ঘুষপেটিয়া’ ও রোহিঙ্গার নাম কাটা হয়েছে।






