কুমিল্লার ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত স্টেডিয়ামে তখন সন্ধ্যা নামছিল। চারপাশে কোলাহল। একদিকে আবাহনীর সমর্থকদের উল্লাস, অন্যদিকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহামেডান শিবিরে নীরবতা। এই দুই বিপরীত স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুলেমান দিয়াবাতে। তাঁর চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

২০১৮ থেকে ২০২৫—দীর্ঘ সাত বছর ধরে মালির এই স্ট্রাইকার মোহামেডানের সমর্থক ছিলেন। সাদাকালো জার্সিতে ১১০টির বেশি ম্যাচ খেলেছেন, করেছেন ১০০ ছুঁই ছুঁই গোল। ছিলেন মোহামেডানের অধিনায়ক। গত মৌসুমে ২৩ বছর পর লিগ শিরোপা জিতলে তিনিই ছিলেন গল্পের মহানায়ক। কিন্তু পেশাদার ফুটবলের নিয়মে আজ তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন চেনা শিবিরের বিপরীতে।

এই মৌসুমে আবাহনীতে যোগ দেওয়ার পর মোহামেডানের বিপক্ষে এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় ম্যাচ। বাংলাদেশ ফুটবল লিগের প্রথম ম্যাচে ৩-২ গোলে হারলে গোলবঞ্চিত থেকে আক্ষেপে পুড়তে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু দিয়াবাতে কখনো দমে যান না। আজকের ২-১ গোলের জয়ে তিনিই নির্ধারণ করলেন ম্যাচের ভাগ্য।

ম্যাচ শেষে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা দিয়াবাতের দিকে এগিয়ে গেলে দেখা গেল, তাঁর চোখেমুখে তৃপ্তির ছাপ। জয়ের অভিনন্দন জানাতেই তিনি শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ, ৩ পয়েন্ট এবং জয় পেয়েছি। আপনারা জানেন, মোহামেডান ও আবাহনীর খেলা সব সময়ই একটি কঠিন লড়াই। আজকের লড়াইটাও সহজ ছিল না। আমি গোল করতে পেরেছি এবং দল জিতেছে, এ জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই।”

সাবেক দলের বিপক্ষে গোল করার সময় কি আবেগ কাজ করছিল? প্রশ্ন করায় দিয়াবাতে একজন নিখুঁত পেশাদার খেলোয়াড়ের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠলেন। মৃদু হেসে বললেন, “না, আমি গোল করতে পেরেই খুশি ছিলাম। কারণ, আবাহনী এখন আমার দল। মোহামেডানের কথা আমি ভুলে গেছি। গত ম্যাচে গোল করতে চেয়েও পারিনি, কিন্তু হাল ছাড়িনি। এই লিগের দ্বিতীয় লেগে এসে সফল হলাম। আমার কাজ এখন আবাহনীকে জেতানো।”

মোজাফরপুরের অলিম্পিক গোলের রোমাঞ্চ ছাপিয়ে দিয়াবাতের জাদুতে আবাহনীর জয়। মোহামেডানের জার্সিতে আবাহনীর বিপক্ষে কতগুলো গোল করেছেন, তা মনে নেই তাঁর। তবে কুমিল্লার এই মাঠেই ২০২৩ সালে ফেডারেশন কাপের ফাইনালে আবাহনীর বিপক্ষে চার-চারটি গোল করেছিলেন। অবিশ্বাস্য সেই ফাইনালে টাইব্রেকারে মোহামেডান জিতেছিল।

সেসব স্মৃতি পোষ মনে রেখেও দিয়াবাতের ভেতর এখন এক কোমল বাবাও লুকিয়ে আছে। গোলটি কাকে উৎসর্গ করতে চান? প্রশ্নে তাঁর চেহারায় উজ্জ্বলতা ফুটে উঠল।

জানালেন, জয়সূচক গুরুত্বপূর্ণ গোলটি উৎসর্গ করেছেন সদ্য জন্মগ্রহণকারী ছেলেকে, “এই গোল আমার ছোট্ট ছেলের জন্য। ওর বয়স মাত্র দুই সপ্তাহ। আমি চেয়েছিলাম ওকে একটি বিশেষ উপহার দিতে। আজকের জয়ের গোলটিই ওর প্রতি আমার ভালোবাসা। ও হয়তো এখনো কিছুই বোঝে না, কিন্তু বড় হয়ে ও দেখবে, ওর বাবা ওকে কতটা মনে রেখেছিল।” দিয়াবাতের স্ত্রী-সন্তান এখন মালিতে। ৩৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার ছেলেকে দেখার অপেক্ষায়, “ওকে এখনো সামনাসামনি দেখিনি। শুধু ছবিতে দেখেছি।”