যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে ইসরায়েল তার প্রতিবেশী দেশগুলোর আরও ভূখণ্ড জবরদখল করছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর গাজা, সিরিয়া ও বর্তমানে লেবাননে ইসরায়েলের ‘বাফার জোন’ (নিরাপদ অঞ্চল) তৈরির এই পদক্ষেপ তাদের কৌশলগত পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। ইসরায়েলের সামরিক ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর ছয়জন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপ দেশটিকে একটি আধা স্থায়ী যুদ্ধের পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, আড়াই বছরের সংঘাতের পর একটি বাস্তবতা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেটি হলো ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব, লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস ও এই অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। ইসরায়েলের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই সত্যেরই স্বীকৃতি মিলেছে।
.কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশেষজ্ঞ নাথান ব্রাউন বলেন, ‘ইসরায়েলি নেতারা এখন এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, তাঁরা এমন এক চিরস্থায়ী যুদ্ধে লিপ্ত, যেখানে প্রতিপক্ষকে সব সময় তটস্থ রাখা এবং ছত্রভঙ্গ করে দেওয়াই মূল লক্ষ্য।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আলোচনার মধ্যে গত বুধবার সাময়িক লড়াই বন্ধে একমত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা বন্ধে রাজি হলেও জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চলবে।
.কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশেষজ্ঞ নাথান ব্রাউন বলেন, ‘ইসরায়েলি নেতারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে তাঁরা এমন এক চিরস্থায়ী যুদ্ধে লিপ্ত, যেখানে প্রতিপক্ষকে সব সময় তটস্থ রাখা এবং ছত্রভঙ্গ করে দেওয়াই মূল লক্ষ্য।’.
গত ২ মার্চ ইসরায়েলে রকেট ছোড়ার মাধ্যমে হিজবুল্লাহ এই যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। এরপর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে। তাদের লক্ষ্য লিতানি নদী পর্যন্ত একটি বাফার জোন তৈরি করা, যা লেবাননের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৮ শতাংশ।
ইসরায়েল ওই এলাকার লাখ লাখ বাসিন্দাকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। শিয়া মুসলিম–অধ্যুষিত গ্রামগুলোয় বাড়িঘর ধ্বংসের কাজও শুরু করেছে তারা। ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহ এসব ঘরবাড়ি অস্ত্র মজুত বা হামলা চালানোর জন্য ব্যবহার করছে।
.ইরানে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে পাঠানো মার্কিন অস্ত্র গায়েব, চটেছেন ট্রাম্প.নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসরায়েলের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা জানান, তাঁদের লক্ষ্য হলো সীমান্ত থেকে ৫-১০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা ‘পরিষ্কার’ করা। এতে ইসরায়েলি সীমান্তশহরগুলো হিজবুল্লাহর রকেটচালিত গ্রেনেড হামলার নাগালের বাইরে থাকবে।
ওই ইসরায়েলি কর্মকর্তা দাবি করেন, সীমান্তের কাছের কিছু লেবানিজ গ্রামে ইসরায়েলি সেনারা প্রমাণ পেয়েছেন, প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িতেই হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অস্ত্র বা সরঞ্জাম রয়েছে।
অবশ্য ওই ইসরায়েলি কর্মকর্তার দাবি কতটা সত্য, রয়টার্স সে বিষয়ে কিছু জানায়নি।
ওই কর্মকর্তার দাবি, এর অর্থ হলো এই বাড়িগুলোকে শত্রুর সামরিক অবস্থান হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে এবং এগুলো অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ লেবাননের অনেক গ্রাম পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হওয়ায় সেখান থেকে সরাসরি ইসরায়েলি শহর বা সেনাক্যাম্প পর্যবেক্ষণ করা যায়।
ইসরায়েলের অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং সাবেক সামরিক কৌশলপ্রধান আসাফ ওরিয়ন বলেন, বাফার জোনের ব্যবহার একটি নতুন নিরাপত্তানীতির প্রতিফলন। এই নীতি অনুযায়ী, ‘সীমান্তবর্তী জনপদকে শুধু সীমান্ত দিয়ে রক্ষা করা সম্ভব নয়।’
.এই ইসরায়েলি সেনা দম্ভ দেখিয়ে বলেন, ‘ইসরায়েল এখন আর হামলার জন্য অপেক্ষা করে না। কোনো হুমকি তৈরি হতে দেখলেই তারা আগেভাগে হামলা চালায়।’
হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে এই বাফার জোন সুরক্ষিত হলে ইসরায়েল কার্যত লেবানন, সিরিয়া, পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার বিশাল ভূখণ্ড দখল বা নিয়ন্ত্রণে রাখবে। গত অক্টোবরে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পর গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা এখনো ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ করা হলে ইসরায়েলের পুরো গাজা থেকে সরে যাওয়ার কথা। তবে অদূর ভবিষ্যতে এমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দম্ভ করে ৩১ মার্চ এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমরা আমাদের সীমান্তের অনেক গভীরে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেছি।’
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘গাজার অর্ধেক ভূখণ্ড এখন আমাদের দখলে। সিরিয়ার মাউন্ট হারমন চূড়া থেকে ইয়ারমুখ নদী পর্যন্ত এবং লেবাননে এক বিশাল বাফার জোন তৈরি করা হয়েছে। এটি অনুপ্রবেশের হুমকি ও আমাদের জনপদে ট্যাংক-বিধ্বংসী হামলা ঠেকাবে।’
.মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংকার দ্রুত সারিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরান: গোয়েন্দা রিপোর্ট.যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভার একজন সদস্য ও দুই কর্মকর্তা বলেন, লেবাননের এই বাফার জোন পরিকল্পনা এখনো মন্ত্রিসভায় পেশ করা হয়নি।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বাফার জোন–সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে। তবে সেখান থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
.ইসরায়েলের অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং সাবেক সামরিক কৌশলপ্রধান আসাফ ওরিয়ন বলেন, বাফার জোনের ব্যবহার একটি নতুন নিরাপত্তানীতির প্রতিফলন। এই নীতি অনুযায়ী, ‘সীমান্তবর্তী জনপদকে শুধু সীমান্ত দিয়ে রক্ষা করা সম্ভব নয়।’.
ইসরায়েল দীর্ঘকাল ধরে তার সীমান্তের বাইরের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে। এর মধ্যে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল করা পশ্চিম তীর, গাজা এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমিও রয়েছে। ১৯৮১ সালে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে গোলান মালভূমিকে নিজের করে নেয়।
বর্তমানে পশ্চিম তীরে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির মধ্যে কয়েক লাখ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বাস করছেন। ফিলিস্তিনিরা এই ভূখণ্ডকে তাঁদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের প্রাণকেন্দ্র মনে করেন।
.বাস্তুচ্যুত লেবানিজ ও ফিলিস্তিনিদের কাছে ইসরায়েলের এই ভূমি দখল মানে ভূখণ্ড আরও বাড়ানো। নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভার কট্টর ডানপন্থীদের বক্তব্যেও সেই সংকেত মিলছে।
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী উগ্রবাদী ইহুদি নেতা বেজালেল স্মোট্রিচ গত মার্চে বলেন, ইসরায়েলের সীমান্ত লিতানি নদী পর্যন্ত বাড়ানো উচিত। তিনি গাজা দখল ও সেখানে ইসরায়েলিদের বসতি গড়ার কথাও বলেছেন।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্য একজন সামরিক কর্মকর্তা জানান, লিতানি নদীকে নতুন সীমান্ত করা হবে না। সেখানে বাফার জোন বজায় রেখে প্রয়োজনে অভিযান চালাবে সেনারা।
ইসরায়েলের আরেক উগ্রবাদী ইহুদি নেতা প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দক্ষিণ লেবাননে গাজার মতো ‘পোড়ামাটি নীতি’ চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গাজার বড় বড় শহরকে যেভাবে জনশূন্য করা হয়েছে, লেবাননেও তেমন ধ্বংসযজ্ঞের ইঙ্গিত দেন তিনি।
.ইরানের এখনো অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ও হাজার হাজার ড্রোন মজুত আছে: মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য.উগ্রপন্থী কাৎজ গত ৩১ মার্চ বলেন, ‘সীমান্তের পাশের যেসব বাড়ি হিজবুল্লাহর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেগুলো গাজার রাফাহ ও খান ইউনিসের মডেলে ধ্বংস করা হবে।’
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এরান শামির-বোরার বলেন, বেসামরিক সম্পদ ধ্বংস করা মূলত বেআইনি। তবে সামরিক কাজে ব্যবহারের প্রমাণ থাকলে তা ভিন্ন কথা।
শামির-বোরার আরও বলেন, সুনির্দিষ্ট সামরিক কারণ ছাড়া দক্ষিণ লেবাননের ঘরবাড়ি ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা আইনসিদ্ধ হবে না।
.দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তিতে ইসরায়েলিরা সন্দিহান
ফিলিস্তিন, লেবানন ও সিরিয়ার সঙ্গে কয়েক দশকের শান্তিচুক্তি করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এরপরই ‘বাফার জোন’ তৈরির কৌশলকে প্রাধান্য দিচ্ছেন যুদ্ধাপরাধে অভিযোগে পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহুর সরকার।
ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আলোচনা বা চুক্তির বিষয়ে ইসরায়েলের ইহুদি জনসাধারণের ব্যাপক অনাস্থা রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের এক জরিপ বলছে, মাত্র ২১ শতাংশ ইসরায়েলি ইহুদি বিশ্বাস করেন, ইসরায়েল ও একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র শান্তিতে পাশাপাশি থাকতে পারবে।
তেল আবিবভিত্তিক ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর জরিপ বলছে, মাত্র ২৬ শতাংশ ইসরায়েলি ইহুদি মনে করেন, গাজার গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনবে। জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষই মনে করেন, দ্রুতই আবারও লড়াই শুরু হতে পারে।
.ওই প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক ওফার শেলাহ বলেন, লেবাননের সঙ্গে কোনো শান্তিচুক্তি না থাকায় উত্তরের বাফার জোনটি হিজবুল্লাহর হামলা বা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সহায়তা করবে।
তবে শেলাহ সতর্ক করে বলেন, লেবানন, গাজা, সিরিয়া ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে একসঙ্গে টহল দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ওপর ব্যাপক চাপ বাড়বে।
ওফার শেলাহ আরও বলেন, ‘আমাদের জন্য ভালো হবে আন্তর্জাতিক সীমান্তে ফিরে যাওয়া এবং সেখানে স্থায়ী চৌকি না রেখে সীমান্তের ওপারে ভ্রাম্যমাণ ও সক্রিয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখা।’
.ইরানে বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে কেন ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়তে পারে উপসাগরীয় দেশগুলোর মানুষ





