টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়ারণ্যে পৌঁছে বেশ হতাশ হলাম। বিল প্রায় শুকিয়ে গেছে, পাখির সংখ্যাও খুব কম। তাই বাইক্কা বিল সফর সংক্ষিপ্ত করে হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশে রওনা দিলাম। বাইক্কা থেকে শ্রীমঙ্গল হয়ে শায়েস্তাগঞ্জের বাসে উঠলাম। শায়েস্তাগঞ্জ নামতেই সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়লাম।
প্রায় সিকি কিলোমিটার পথ যেতে যেতে এক বাঁশঝাড়ের সামনে এসে ড্রাইভার অটো থামিয়ে বললেন, ‘স্যার, সামনেই আমার বাসা। অনুমতি দিলে মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসব।’ ‘ঠিক আছে, যাও। আমরা একটু বাঁশঝাড়টা দেখি।’—এই বলে ক্যামেরা নিয়ে বাঁশঝাড়ে ঢুকলাম।
বাঁশঝাড়ের উপরের দিকে আলো-আঁধারিতে একটি পাখি বসে থাকতে দেখে তাড়াতাড়ি কয়েকটা ছবি তুললাম। কিন্তু তার মুখের স্পষ্ট ছবি পেলাম না। একবার সে একটু তাকালেও, মাত্র একটা ছবি তুললাম যা মনের মতো হয়নি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেও তার গোমড়ামুখ দেখা যায়নি। সময় কম থাকায় সাতছড়ির দিকে রওনা হলাম। এ ঘটনা ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮-এর। এরপর বিভিন্ন সময় দেশের নানা জায়গায় পাখিটিকে খুঁজেছি, কিন্তু আর দেখতে পাইনি।
সাত বছর পর ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাজারিখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে তার সঙ্গে কিছুক্ষণের দেখা হয়। কিন্তু ভালো ছবি তুলতে পারিনি।
অবশেষে পাখি পর্যবেক্ষণ গ্রুপ ‘বার্ডিংবিডি ট্যুরস’-এর আয়োজনে ছয়জনের দলে এ বছরের ২৫ মার্চ রাতে হাজারিখিলের জন্য রওনা হলাম। ভোরে পৌঁছে সারাদিন অভয়ারণ্যের বিভিন্ন স্পটে পাখি খুঁজে ঘুরলাম। রাতে গেস্টহাউস থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের ছোট টিলায় উঠে মোবাইলে লালচে নিমপোখের (মাউন্টেন স্কুপ আউল) ডাক শুনিয়ে নিঃশব্দে বসে রইলাম। লালচে নিমপোখ দূর থেকে প্রতি–উত্তর দিলেও কাছে আসেনি। তারপর শায়েস্তাগঞ্জের বাঁশঝাড়ের ছোট প্যাঁচাটির ডাক বাজালাম। কয়েকবার ডাকার পর খুব কাছ থেকে প্রতি–উত্তর এল। দলের একজন গাছে টর্চের আলো ফেলতেই পাখিটিকে দেখতে পেলাম। বিরক্ত হওয়ার আগেই দ্রুত ছবি তুলে টর্চ বন্ধ করলাম।
শায়েস্তাগঞ্জের বাঁশঝাড় ও হাজারিখিলে দেখা এ পাখিটি ছোট নিমপোখ। কালো দাগওয়ালা নিমপোখ বা ছোট নিমপ্যাঁচা নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে কোকিলকণ্ঠী প্যাঁচা বলা হয়। ইংরেজি নাম ওরিয়েন্টাল, নর্থ ইন্ডিয়ান বা ইউরেশিয়া স্কুপ আউল। ইস্ট্রিলজিডি গোত্রের এ প্যাঁচার বৈজ্ঞানিক নাম Otus sunia। বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান থেকে জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও সাইবেরিয়ার পূর্বাঞ্চলে এদের বৈশ্বিক বিস্তার রয়েছে।
ছোট নিমপোখ ছোটখাটো আকারের পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ১৭-২১ সেন্টিমিটার। ওজন ৭৫-৯৫ গ্রাম। তিনটি বর্ণরূপ রয়েছে—লালচে, বাদামি ও ধূসর। কানঝুঁটি ও মুখমণ্ডলের গোলকের চারপাশে লালচে রং। গলায় গলাবন্ধ নেই। দেহের উপরের পালকে সামান্য দাগছোপ থাকলেও মাথা ও নিচের পালকে প্রচুর দাগছোপ। চোখ হলুদ, চঞ্চু ও পা ধূসরাভ। প্যাঁচা-প্যাঁচীর চেহারায় কোনো তফাত নেই। ছোট আকার, হলুদ চোখ, কানঝুঁটি, মুখমণ্ডলের গোলের চারপাশে লালচে ও গলাবন্ধের অনুপস্থিতিতে নিমপোখ (কলার স্কুপ আউল) থেকে আলাদা করা যায়।
দেশের বন-বাগান ও গাছপালাভরা গ্রামীণ এলাকায় এদের দেখা যায়। একাকী বা জোড়ায় থাকে। দিনে গাছের ছায়াঘেরা ডালে বা বাঁশঝাড়ে লুকিয়ে থাকে। রাতে গাছে বসে মাটিতে শিকার খোঁজে। খাদ্যে কীটপতঙ্গ, টিকটিকি, ইঁদুর, ছোট পাখি ইত্যাদি। নমনীয় স্বরে ‘টুক-টুক-কু-রুক—-’ শব্দে তিন-চারবার ডাকে।
মার্চ থেকে আগস্ট প্রজননকাল। তখন প্যাঁচা সারারাত ডাকে। বাসা গাছের প্রাকৃতিক কোটরে বা কাণ্ডের গর্তে। প্যাঁচী পাড়ে তিন থেকে পাঁচটি সাদা ডিম। প্যাঁচী একাই ডিমে তা দেয়, প্যাঁচা তাকে খাওয়ায়। ডিম ফোটে ২২-২৫ দিনে। উভয়ই ছানা লালন করে। আয়ু তিন-চার বছর।
আ ন ম আমিনুর রহমান : পাখি, বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ






