নাসার আর্টেমিস ২ চন্দ্রাভিযান ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে। চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণের লক্ষ্যে চার নভোচারী ওরিয়ন মহাকাশযানে চড়ে যাত্রা শুরু করেন। উৎক্ষেপণ থেকে এ পর্যন্ত সব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় সফল হয়েছে এই অভিযান। রকেট, মহাকাশযান এবং নভোচারীদের কার্যক্ষমতা প্রকৌশলীদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
১০ দিনের এই অভিযানের প্রথম ছয় দিনে ওরিয়ন ক্যাপসুল প্রত্যাশিতভাবে কাজ করেছে।
আর্টেমিস ২–এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো নভোচারীদের ব্যাপক সক্ষমতা প্রমাণিত হওয়া, যা মহাকাশ অভিযান নিয়ে নতুন আশা জাগিয়েছে। চাঁদে অবতরণ না হলেও, নভোচারীরা পৃথিবী থেকে চাঁদের পেছন দিকের এক দূরবর্তী স্থানে পৌঁছেছেন, যেখানে আগে কোনো মানুষ যায়নি।
অভিযানের সময় কিছু সমস্যা দেখা গেছে। শৌচাগারে সমস্যা হয়েছে। পানি বিতরণ ব্যবস্থায়ও সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তখন নভোচারীদের সতর্কতামূলকভাবে পানি ব্যাগে সংরক্ষণ করতে হয়েছে।
কেনেডি স্পেস সেন্টারের উৎক্ষেপণ স্থলে নাসার এসএলএস রকেট পৌঁছানোর কয়েক দিন পরই আর্টেমিস ২ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছে নাসা।
গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে প্রযুক্তিগত সমস্যায় দুবার উৎক্ষেপণ বাতিল হয়েছিল। নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেছেন, ‘এসএলএস-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল রকেটকে তিন বছর অন্তর উৎক্ষেপণ করাটা যে সাফল্য পাওয়ার পথ হতে পারে না, তা তাঁরা বুঝতে পেরেছেন।’
এর আগে ২০২২ সালের নভেম্বরে নাসা আর্টেমিস ১ অভিযান চালিয়েছিল, তবে তাতে কোনো মানুষ ছিল না, শুধু মহাকাশযান গিয়েছিল। জ্যারেড আইজ্যাকম্যানের মতে, প্রতিটি রকেটকে ‘একটি শিল্পকর্মের মতো’ বিবেচনা করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে নিয়মিত উৎক্ষেপণ শুরু করতে হবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ১ এপ্রিল নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ ও জেরেমি হ্যানসেন চাঁদের পথে যান।
অভিযানের প্রথম ছয় দিনে কী দেখা গেল? সংক্ষেপে বললে, আশাবাদীদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাফল্য।
রকেটের সফলতা
উৎক্ষেপণের সময় সব মাপকাঠিতে এসএলএস রকেট নিখুঁতভাবে কাজ করেছে। সর্বোচ্চ চাপ, ইঞ্জিন বন্ধ, বুস্টার আলাদা হওয়া—সব ঠিকঠাক। চাঁদের পথে তিনটি কোর্স সংশোধনের মধ্যে দুটি বাতিল হয়েছে, কারণ সবকিছু নিখুঁত ছিল।
এর আগে ২০২২ সালের নভেম্বরে আর্টেমিস ১ অভিযান পরিচালনা করেছিল নাসা। তবে ওই অভিযানে কোনো মানুষকে পাঠানো হয়নি, শুধু মহাকাশযান গিয়েছিল। নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যানের মতে, প্রতিটি রকেটকে ‘একটি শিল্পকর্মের মতো’ বলে বিবেচনা করার প্রবণতা থেকে নাসাকে বের হয়ে আসতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির মতো নিয়মিত উৎক্ষেপণ শুরু করতে হবে।
নভোচারীদের জীবনযাত্রা
অভিযানের লক্ষ্য ছিল ওরিয়ন ক্যাপসুলে মানুষ নিয়ে তার কার্যকারিতা ও মানুষ-যন্ত্রের মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ। অনেক বিষয় প্রত্যাশামতো ঘটেছে।
অভিযানের সময় কিছু সমস্যা দেখা গেছে। শৌচাগারে সমস্যা হয়েছে। পানি বিতরণ ব্যবস্থায়ও সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তখন নভোচারীদের সতর্কতামূলকভাবে পানি ব্যাগে সংরক্ষণ করতে হয়েছে।
প্রকৌশলীরা কার্বন ডাই–অক্সাইড অপসারণ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করছেন, যাতে চাঁদে নিরাপদ অবতরণের যোগ্যতা যাচাই হয়।
বৈজ্ঞানিক অর্জন নাকি প্রচার?
নাসা বৈজ্ঞানিক অর্জনের কথা বলেছে। নভোচারীরা প্রায় ৩৫টি ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য লিপিবদ্ধ করেছেন, খনিজ সংমিশ্রণ পর্যবেক্ষণ করেছেন, দূর মহাকাশ থেকে সূর্যগ্রহণ দেখেছেন।
বিশেষ ছবি হলো চাঁদের উল্টো দিকের ৬০০-মাইল ব্যাসের গর্তের, যা প্রথমবার মানুষের চোখে পূর্ণরূপে দেখা দিয়েছে।
তবে অক্সফোর্ডের অধ্যাপক ক্রিস লিনটট বলেছেন, ‘আর্টেমিস এবং এর নভোচারীদের কাছ থেকে পাওয়া ছবিগুলোর শৈল্পিক মান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বৈজ্ঞানিক মূল্য সীমিত।’ কারণ, ভারতের চন্দ্রযান-৩ ২০২৩ সালে চাঁদের দক্ষিণ প্রান্তে অবতরণ করেছে এবং চীনের চ্যাং’ই-৬ ২০২৪ সালে চাঁদের উল্টো পাশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে।
অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নভোচারীদের কারণে—১৯৭০ সালের পর প্রথম চাঁদের পেছন অংশ ঘুরে আসা এবং রেকর্ড ভাঙা দূরত্বে পৌঁছানো।
যেসব মহাকাশ কর্মসূচি মানবিক অনুভূতি জাগায় না, সেগুলো টেকে না। অ্যাপোলোর স্মৃতি প্রযুক্তি ও মানুষের সাহসের কারণে টিকে আছে। আর্টেমিস ২ও তেমন বার্তা দিচ্ছে।
সামনের বড় পরীক্ষা
অভিযান এখনো শেষ হয়নি। ওরিয়ন পৃথিবীর দিকে ফিরছে এবং সান ডিয়েগোর কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে। বাকি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ। আর্টেমিস ১–এ এতে সমস্যা হয়েছিল, তাপ প্রতিরোধকব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এক বছর দেরি হয়। এবার ঘণ্টায় প্রায় ২৫ হাজার মাইল গতিতে প্রবেশ করবে।
যদি এটি সফল হয়, তাহলে অভিযান অনুপ্রেরণা জোগাবে। রকেট, মহাকাশযান ও নভোচারীরা সব দক্ষতার সাথে কাজ করেছে।
নাসা এখন নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনায় কাজ শুরু করবে, তিন বছর অপেক্ষা নয়। ২০২৮ সালের চাঁদ অবতরণ চ্যালেঞ্জিং, তবে এই মসৃণ অভিযান আশা জাগিয়েছে। ওরিয়ন তার যোগ্যতা প্রমাণ করেছে।
আর্টেমিস ২ অনুপ্রেরণা ও বৈজ্ঞানিক গল্প, চাঁদ অবতরণের পরীক্ষামূলক ধাপ। এটি শেষ নয়, সামনে আরও থাকবে।






