ভ্রমণকাহিনির প্রতি পাঠকের আকর্ষণ কখনোই কমে না। এই আগ্রহ থেকেই পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ভ্রমণপঞ্জির প্রতি আমরা টান অনুভব করি। বইটি হাতে নিলে মনে আনন্দের উথালি পড়ে যায়। এর প্রচ্ছদ অসাধারণ—যেন দুই হাজার বছর আগের রোমান সাম্রাজ্যাধীন মিসরের নীলনদ চলমান ছবির মতো ভেসে ওঠে। নদীর উপকূলে সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র এবং বিশ্বভ্রমণকারী মাঝারি আকারের মজবুত নৌযান। বইটির আরেক আকর্ষণ এর সংক্ষিপ্ততা। রয়েল সাইজের এই গ্রন্থ মাত্র ৬৭ পৃষ্ঠার। বর্তমানের স্বল্প মনোযোগের যুগে এর আকার স্বস্তি জোগায়। খুব সহজেই দ্রুত পড়া যায়।
এবার আসুন বইটির বিষয়ে বিস্তারিত। সহজভাবে বললে, এটি দুই হাজার বছর আগে গ্রিস থেকে বাংলায় এক যাত্রার বন্দরকেন্দ্রিক খুঁটিনাটি বিবরণ। লিপিবদ্ধ হয়েছিল নাম অজ্ঞাত জাহাজটির লগবুকে। গ্রিক ভাষায় এটিকে বলা হয় পেরিপ্লাস, যা ৬৬ টুকরো কাঠ থেকে তৈরি প্যাপিরাসে লেখা। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সভ্যতায় ঘুরে দ্য পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথ্রিয়ান সি নামে প্রকাশিত হয়।
অনুবাদক বইটির ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, প্রাচীন এই গ্রন্থ নেহাত বাণিজ্যিক কারণে লেখা হলেও এখানে দুর্লভ প্রাচীন ভৌগোলিক তথ্য আছে, যা বিশ্ব-ইতিহাসচর্চায় অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে।
এর বাংলা সংস্করণের নাম সমুদ্রপথে গ্রিস থেকে বাংলায়: পৃথিবীর প্রচীনতম ভ্রমণপঞ্জি। অনুবাদক হারুন রশীদ এটি অনুবাদ করেছেন ব্রিটিশ অনুবাদক জি ডব্লিউ বি হান্টিংফোর্ডের কাছ থেকে। তিনি ১৯৮০ সালে গ্রিক থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন।
দুই হাজার বছর আগে পৃথিবীর মানচিত্র এবং স্থাননামকরণ আজকের মতো ছিল না। এই ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখেছিলেন এক গ্রিক নাবিক। তখন গ্রিকরা স্থানগুলো নিজেদের মতো করে নামকরণ করত। যেমন গ্রিক ভূগোলবিদ ক্লদিয়াস টলেমির বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১২টি মানচিত্রের একটিতে পেন্টাপলিস নামের এলাকার উল্লেখ আছে, যার অর্থ পাঁচ নগরের কেন্দ্রভূমি। এটি আজকের চট্টগ্রাম। অনুবাদক বইটির ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, প্রাচীন এই গ্রন্থ নেহাত বাণিজ্যিক কারণে লেখা হলেও এখানে দুর্লভ প্রাচীন ভৌগোলিক তথ্য আছে, যা বিশ্ব-ইতিহাসচর্চায় অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। (পৃষ্ঠা: ১১)
ভূমিকা বাদে বইটির মাত্র দুটি অধ্যায়। প্রথমটির নাম ‘লোহিত সাগর থেকে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল’ এবং দ্বিতীয়টি ‘লোহিত সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর’। এই দুই অধ্যায়ে ওই ৬৬টি প্যাপিরাস পাতার বিবরণ ভাগ করে তুলে ধরা হয়েছে, যার অনেকগুলো খুব ছোট—মাত্র দু-চার বাক্যের।
গ্রন্থটি এক নাবিকের বর্ণনা, যিনি নৌযানে আফ্রিকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছেছিলেন। প্রথম অংশে লোহিত সাগর থেকে আফ্রিকার উপকূলের বিভিন্ন বন্দর ও বাণিজ্যের বিবরণ রয়েছে। উল্লেখ আছে হাতির দাঁত, বিরল সাদা কচ্ছপ, মিহি কাপড়, কচ্ছপের খোল, গোলমরিচ, তেজপাতা, কাঁচা জলপাই, বস্ত্র, ভুট্টা, সুগন্ধি রস, শক্ত দারুচিনির প্রাপ্তিস্থান ও ব্যবসার নানা ধরন। এছাড়া বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে, যা নৃতাত্ত্বিক গবেষকদের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
যেমন, ৫৮ পৃষ্ঠায় ৬২ নম্বর অনুচ্ছেদে ভারতীয় উপমহাদেশের মাসালিয়া এলাকার বর্ণনা। সেখানে প্রচুর মসলিন বস্ত্র উৎপাদিত হয়। এ অঞ্চল থেকে সংলগ্ন উপসাগর পেরিয়ে পূর্বে ডোসারিন অঞ্চল, যেখানে ডোসারিন নামে আইভরি পাওয়া যায়। সেখান থেকে উত্তরে অনেক বর্বর জাতি, যার মধ্যে কিরাদিয়া অন্যতম। নাক বোঁচা সেই জাতির লোকেরা অত্যন্ত অসভ্য প্রকৃতির। (পৃষ্ঠা: ৫৮)
ইতিহাস ও ভ্রমণকাহিনি পছন্দ করলে বইটি আপনার ভালো লাগবে। এতে শিল্পীর আঁকা কয়েকটি ছবি রয়েছে। ছবি আরও থাকতে পারত এবং গ্রিক শব্দগুলোর সহজ ব্যাখ্যা যোগ করা যেত। তবু, এটি এক ঐতিহাসিক দলিল। বইটি নিয়ে সময় কাটালে ভালো লাগবে।
সমুদ্রপথে গ্রিস থেকে বাংলায়: পৃথিবীর প্রচীনতম ভ্রমণপঞ্জি
মূল লেখক: সমুদ্র জাহাজের লগবুক লেখক
অনুবাদ: হারুন রশীদ
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২৬
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
পৃষ্ঠা: ৬৮
মূল্য: ২০০ টাকা






