সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি 'সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ' জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হয়েছে। এই অধ্যাদেশের ভিত্তিতেই গত বছর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

গতকাল বুধবার দুপুরে সংসদে 'সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল' পাস হয়। বিলে অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে কোনো সত্তাকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতাও আইনে অটুট রয়েছে। আগের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সত্তা নিষিদ্ধ করার বিধান থাকলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার কোনো অবস্থান ছিল না।

ওই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে গতকাল জাতীয় সংসদে বিল পাস হলো। ফলে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকল।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১১ মে এই অধ্যাদেশ জারি করে আইনে সন্ত্রাসী সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করেছিল। এর ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

ওই অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরিত করতে গতকাল সংসদে বিলটি পাস হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অপরিবর্তিত এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি রহিত এবং ১৬টি পরবর্তীতে শক্তিশালী করে নতুন বিল আনার পরামর্শ দেওয়া হয়।

যে ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত করে অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছিল, তার মধ্যে একটি ছিল সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ। তবে গতকাল পাসকৃত বিলে কোনো সংশোধনী আনা হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদই বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন।

বিল পাসের আগে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এ নিয়ে আপত্তি জানান। তিনি বলেন, এ–সংক্রান্ত একটি তুলনামূলক শিট তাঁরা তিন–চার মিনিট আগে হাতে পেয়েছেন। তাঁরা এটি পুরো পড়তে পারেননি। আইনটি অবশ্যই একটি স্পর্শকাতর আইন। আইনটি পাসের জন্য তাঁদের আরও একটু সময় দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপত্তি জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। সেই সময় আপত্তি হলে আমরা গ্রাহ্য করতে পারতাম। বিলের এই পর্যায়ে এসে আর আপত্তির সুযোগ নেই।’

জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে শিটটা তো পেয়েছি এইমাত্র।’ তখন স্পিকার বলেন, ‘এ বিষয়টি হয়তো পরে আমরা দেখব। বিলের এই পর্যায়ে আপত্তির কোনো সুযোগ নেই।’

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের প্রস্তাব করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘বিলটি একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নিষিদ্ধকরণ–সংক্রান্ত একটি সংশোধনী। আগের যে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ছিল, তা সংশোধনের জন্য। বিরোধীদলীয় নেতার নিশ্চয় স্মরণ থাকার কথা, ওনারা এবং এনসিপির বন্ধুরা সবাই মিলে একটি আন্দোলন করেছিলেন। সেই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে মোটামুটি বাংলাদেশে একটা জনমত সৃষ্টি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষিতে তাদের (আওয়ামী লীগের) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে তাদের নিবন্ধনও স্থগিত হয়ে আছে। এই আইনের অনুবলে পরবর্তীতে ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইসিটি অ্যাক্টকেও (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন) পরিবর্তন এনে সংগঠনের বিচারে বিধান যুক্ত করে সেই আইনটাও সংশোধন করা হয়েছে।’

এরপর বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।

বিলে উল্লেখ আছে, সন্ত্রাসী কাজে জড়িত কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারবে অথবা সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে পারবে।

বিলে এ ধরনের ক্ষেত্রে কয়েকটি নিষেধাজ্ঞার বিষয় যুক্ত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘উক্ত সত্তা কর্তৃক বা তার পক্ষে বা সমর্থনে যেকোনো প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা বা মুদ্রণ কিংবা গণমাধ্যম, অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে যেকোনো ধরনের প্রচারণা, অথবা মিছিল, সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসম্মুখে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করবে।’

এছাড়া গতকাল সরকারি হিসাব নিরীক্ষা বিল, প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল, জাতির পিতার পরিবার–সদস্যগণের নিরাপত্তা (রহিতকরণ) বিল, স্থানিক পরিকল্পনা বিল, পরিত্যক্ত বাড়ি সম্পূক বিধানাবলি (সংশোধন) বিল, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) (সংশোধন) বিল, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল, বাংলাদেশ বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (রহিতকরণ) বিল, কোড অব সিভিল প্রসিডিউর (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল এবং শেখ হাসিনা পল্লি উন্নয়ন একাডেমি, জামালপুর (সংশোধন) বিলও সংসদে অনুমোদিত হয়। এসব বিলের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।