প্রচারের শেষপর্যায়ে আসামে তিক্ততার জোয়ার এমনভাবে ছড়িয়ে পড়বে, কেউ কি আগে থেকে অনুমান করতে পেরেছিলেন? হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও গৌরব গগৈয়ের মধ্যে রাজনৈতিক বৈরিতা তুষের আগুনের মতো জ্বলছিল ঠিকই। তবে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং তাঁর কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বী গৌরব গগৈয়ের এই রেষারেষি হঠাৎ এতটা তীব্র হয়ে উঠবে, তা বোঝা যায়নি। আগামীকাল বিধানসভা নির্বাচনে এই আগুন কার গড়ের কতটা ক্ষতি করবে, সেটাই এখন সবার মূল আগ্রহ।
এরপাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও উঠে এসেছে। কংগ্রেসের সর্বভারতীয় মুখপাত্র পবন খেরা কি এবারও আসাম পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাবেন এবং সম্ভাব্য জেলযাত্রা ঠেকাতে পারবেন?
রেষারেষির ঘটনাগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা যাক। হিমন্ত বিশ্বশর্মা বেশ কিছুদিন ধরে গৌরব গগৈ এবং তাঁর স্ত্রী এলিজাবেথ ক্লেয়ার গগৈয়ের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সংস্রবের অভিযোগ তুলে আসছেন। ‘লিড পাকিস্তান’ নামক পাকিস্তানের একটি এনজিওর প্রধান আলী তওকির শেখের সঙ্গে এলিজাবেথের ঘনিষ্ঠতার কথা বলা হয়েছে, যা জলবায়ু আন্দোলন নিয়ে কাজ করে। এর ফলে এলিজাবেথ নাকি পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন।
এই অভিযোগের পর আসাম পুলিশ তওকির শেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে। হিমন্ত এই বিষয়গুলো ভোটের প্রচারে ব্যবহার করে গৌরবকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করছেন। গৌরব বারবার বলেছেন, প্রতিটি অভিযোগই অসার এবং কাল্পনিক। হিমন্ত ও গৌরবের এই আকাশকুসুম যুদ্ধ ক্রমশ বিজেপি ও কংগ্রেসের তীব্র রেষারেষিতে রূপ নিয়েছে, যাতে ঘৃতাহুতি দিয়েছেন পবন খেরা।
তিন দিন আগে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে পবন খেরা বলেন, হিমন্তের স্ত্রী রিনিকি ভূইয়া শর্মার নামে তিনটি দেশে পাসপোর্ট ইস্যু হয়েছে—মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অ্যান্টিগা ও বারমুডা। পবন খেরা আরও অভিযোগ করেন, হিমন্ত পরিবার ৫২ হাজার কোটি রুপির ব্যবসা আড়াল করেছে।
ভোটের বাজারে সব ইস্যু ছাপিয়ে এই আকাশকুসুম যুদ্ধই আসামে প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। পবন খেরার বিরুদ্ধে রিনিকি রাতারাতি এফআইআর করেন। এরপর দিল্লি চলে আসে আসাম পুলিশের একটি দল খেরাকে গ্রেপ্তার করতে। গত মঙ্গলবার তারা দিল্লিতে খেরার বাড়ি ঘিরে তল্লাশি চালায়, দিল্লি পুলিশের সহযোগিতায়। খেরাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বলেছেন, খেরা হায়দরাবাদে গা ঢাকা দিয়েছেন। ধরা তাঁকে হবেই।
পবন খেরা ও হিমন্তের ‘শত্রুতা’ নতুন নয়। ২০২৩ সালে দিল্লি বিমানবন্দরে রায়পুরগামী বিমান থেকে খেরাকে নামিয়ে আসাম পুলিশ গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ ছিল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাবার নাম নিয়ে খেরা বিরূপ মন্তব্য করেছেন এবং সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চাইছেন। আসামের হাফলংয়ে এই অভিযোগে মামলা হয় এবং অন্যান্য রাজ্যেও এফআইআর করা হয়। খেরা সেদিনই সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পান।
আগামীকাল বৃহস্পতিবারের ভোটের আগে আসামে এসব নিয়েই উত্তেজনা চরমে। গতবারের চেয়ে এবার আরও বেশি আসনে জয় নিয়ে হিমন্ত নিশ্চিন্ত মনে হচ্ছে। তিনি বলছেন, নতুন সরকার গড়ে প্রথমেই এই ‘কাদাছড়া’ শেষ করবেন। ওটাই তাঁর ‘প্রায়োরিটি’।
জয় কি এত সহজ?
রাজ্যের ১২৬ আসনের মধ্যে গতবার বিজেপি ৬০টি জিতেছিল, জোট পেয়েছিল আরও ১৫টি। কংগ্রেস ২৯টি এবং তাদের মহাজোট ৫০টি আসন পেয়েছিল।
হিমন্ত ঘোষণা দিয়েছেন, এবার ৯০ আসন ছাড়বেন। মুসলিমদের কোণঠাসা করার চেষ্টার পাশাপাশি কংগ্রেস ভেঙে প্রদ্যুত বরদলুই, ভূপেন বরা, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ, শশীকান্ত দাস, বসন্ত দাসদের মতো নেতাদের দলে নিয়ে এসেছেন। বিজেপির টিকিট পেয়েছেন ৩০ জন দলবদলকারী নেতা, অধিকাংশ সাবেক কংগ্রেসি। এতে রাজ্যে পুরনো ও নতুন বিজেপির মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। তবু হিমন্ত নিজের শক্তিতে বলিষ্ঠ। ধর্মীয় মেরুকরণ তাঁর প্রধান অস্ত্র।
প্রচারে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ বারবার বলেছেন, আসামকে পুরোপুরি বাংলাদেশি ‘ঘুষপেটিয়ামুক্ত’ করবেন। আসামের ভোট ঐতিহ্যগতভাবে ‘আলী–কুলি–বাঙালি’র। আলী মানে মুসলিম (প্রায় ৪০ শতাংশ), কুলি মানে চা বাগানের শ্রমিক (প্রায় ২০ শতাংশ) এবং হিন্দু বাঙালি। এরা আগে কংগ্রেসের ভরসা ছিল। সাবেক কংগ্রেসি হিমন্ত এই তিন ঘরে সিঁধ কেটে বিজেপিকে ভাসিয়ে রেখেছেন।
হিমন্তের পরিকল্পনায় নির্বাচন কমিশন আসামে এসআইআর করেনি। যুক্তি, এনআরসি আগেই হয়েছে। তাই ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন করা হয়েছে, যাতে মুসলিমরাই বাদ পড়েছেন।
আপার আসাম ও জুবিনের খচখচে কাঁটা
আসামে ভোটের দায়িত্ব কংগ্রেস প্রিয়াঙ্কার হাতে তুলে দিয়েছে। প্রচারে তিনি ও রাহুল জুবিন গর্গকে টেনে এনেছেন। ইশতেহারে লেখা, ক্ষমতায় এলে ১০০ দিনের মধ্যে ‘নিরপেক্ষ’ তদন্ত করে জুবিনের মৃত্যুরহস্য উদঘাটন করা হবে।
জুবিন সিএএ, এনআরসির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। সিঙ্গাপুরে মৃত্যুর সময় বিজেপি-ঘনিষ্ঠদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শাসক দলের কাছে এটি খচখচে কাঁটা। আসাম নববর্ষে প্রথমবার জুবিনহীন বোহাগ বা রঙালি বিহু উদযাপিত হবে, ভোট তার এক সপ্তাহ আগে।
কংগ্রেস ‘জেন–জি’ প্রজন্মকে টানতে চাইছে। ৭৩ লাখ ‘জেন–জি’ ভোটারের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ।
বিজেপির ঘর বলে আপার আসাম বা উত্তর আসাম এবার হিমন্তের জয়লক্ষ্য। ২০২৪ লোকসভা ভোটে যোরহাট থেকে গৌরব দেড় লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। সেখানে ১০টি বিধানসভায় ৯টিতে কংগ্রেস এগিয়েছিল। গৌরবকে সেখান থেকে প্রার্থী করেছে কংগ্রেস। ইঙ্গিত, সরকার গড়লে তিনিই মুখ্যমন্ত্রী হবেন।
আপার আসাম রাজ্যের নার্ভ সেন্টার ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। গোপীনাথ বরদলুই, বিমল চালিহা, হিতেশ্বর শইকিয়া, তরুণ গগৈয়ের মতো নেতারা এখানকার ভূমিপুত্র। শিবসাগর, যোরহাট, তিনসুকিয়া, ডিব্রুগড়ে ৪১টি আসন। গতবার বিরোধীরা ৪টি পেয়েছিল। হিমন্ত এখানে মাটি কামড়ে ধরে আছেন, গৌরব অহম জাত্যভিমান জাগিয়ে চ্যালেঞ্জ করছেন।
কংগ্রেস ১০১ আসনে লড়ছে। নতুন জোট অসম জাতীয় পরিষদ (এজেপি), অখিল গগৈয়ের রাইজর দল, অল পার্টি হিল লিডার্স কনফারেন্স ও বামপন্থীদের সঙ্গে। ২৫ আসন ছাড়া হয়েছে। এআইইউডিএফকে ত্যাগ করেছে কংগ্রেস, তারা বিজেপির ‘বি’ টিম।
অনগ্রসর ও তফসিলিরা
কংগ্রেসের ইশতেহারে ৬ অনগ্রসর জাতি বা ওবিসি সমাজের দাবি প্রাধান্য পেয়েছে। তাই, অহম, মোরান, মটক, চুতিয়া, কোচ–রাজবংশী ও চা উপজাতি/আদিবাসীদের তফসিলি মর্যাদার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এরা আপার আসাম ও ব্রহ্মপুত্রের উত্তর তীরের বাসিন্দা। কেন্দ্রের বিজেপি এ দাবি মানেনি। হিমন্ত ইশতেহারে ‘বিবেচনা’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দুজনেই আপার আসামের দিকে তাকিয়ে আছেন। কাল ভোট, ফল প্রকাশ ৪ মে।






