সিলেট নগরে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন, যদিও পুলিশ দাবি করছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। মহানগর পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিভিন্ন মাধ্যমে এই কথাই বলছেন।
সিলেটের বালাগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রভাষক অহী আলম রেজা তাঁর তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছিলেন। নগরের আম্বরখানা মোড় থেকে যাত্রী পরিবহনে থাকা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তিনি ওঠেন। তখন যানটির সামনে চালকের পাশে একজন এবং পেছনে আরেকজন যাত্রী ছিলেন। কিছু দূর গিয়ে চালক আরেকজন যাত্রীকে পেছনের আসনে তোলেন।
অহী আলম রেজাকে নির্দিষ্ট গন্তব্য শাহি ঈদগাহ এলাকায় নামানোর আগে যাত্রীবেশী সেই ব্যক্তিরা ছুরি বের করে তাঁর ছেলেকে আঘাত করার ভয় দেখায়। ছেলের জীবন রক্ষায় অহী আলম রেজা তাঁর সঙ্গে থাকা প্রায় ২১ হাজার টাকা তাদের হাতে তুলে দেন। পরে ছিনতাইকারীরা অহী আলম ও তাঁর ছেলেকে নির্জন জায়গায় নামিয়ে দিয়ে চলে যায়।
গত শনিবার বিকেলে প্রকাশ্যে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী অহী আলম মহানগরের বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। কিন্তু এ ঘটনা একটি নয়, সম্প্রতি নগরে তুলনামূলকভাবে চুরি-ছিনতাই বেড়েছে। ফলে নগরবাসীরা ভয়ে কাঁপছেন।
অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, থানা বা হাসপাতালে গেলেই ছিনতাই বা চুরির ঘটনা গণমাধ্যমে আসছে। এর বাইরে অনেক ঘটনা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। তবু মহানগর পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নগরে আইনশৃঙ্খলা ভালো বলেই দাবি করছেন।
জানতে চাইলে সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "এক-দুটি বিচ্ছিন্ন ছিনতাইয়ের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যেভাবে বলা হচ্ছে ছিনতাই বেড়েছে, এটা ঠিক নয়। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। ছিনতাই যেন না ঘটে, এ জন্য পুলিশ টহল দেওয়া থেকে শুরু করে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।"
সিলেট মহানগর পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত মহানগরের ছয় থানায় ২৪ জন ডাকাত, ১৫৭ জন ছিনতাইকারী ও ২৩১ জন চোর গ্রেপ্তার হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৪টি ছিনতাই ও ১৬টি চুরির মামলা হয়েছে। এ ছাড়া মার্চ মাসে ৭টি ছিনতাই ও ১৯টি চুরির মামলা হয়েছে, যা বিগত অন্যান্য মাসের তুলনায় কম। এ ছাড়া নগরে ১০ বছরের অপরাধের কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে সম্প্রতি ২৬৩ জন ছিনতাইকারীর একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
বিগত সময়ের তুলনায় সিলেট নগরে সম্প্রতি ছিনতাই বেড়েছে বলে দাবি করেছেন সিলেটের নাগরিক আন্দোলনের পরিচিত মুখ এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম। জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি বলেন, "সিলেটে পরপর কতগুলো ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।"
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকা দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এক নারী যাচ্ছিলেন। তখন তিনি ছিনতাইয়ের শিকার হন। ওই ঘটনার ৩৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়, একটি মোটরসাইকেল এসে অটোরিকশাটির গতিরোধ করে। পরে আরও দুটি মোটরসাইকেল যোগ হয়। একটি মোটরসাইকেল থেকে এক যুবক নেমে নারীর কাছ থেকে ব্যাগ টান দেন। নারীর সঙ্গে ব্যাগ নিয়ে টানাটানি হয়। শেষে যুবক ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে মোটরসাইকেলে উঠে চলে যায়। পরে নারী অটোরিকশা থেকে নেমে মোটরসাইকেলের দিকে যান।
পুলিশ জানায়, নারীর ব্যাগে ১৫ হাজার টাকা, কয়েকটি ব্যাংকের চেক বই ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল। পরে গত ৫ মার্চ সাগরদিঘিরপার এলাকার একটি ছিনতাইয়ের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী হেঁটে যাচ্ছেন। মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তি তাঁর গতিরোধ করেন। তাঁদের একজনের হাতে ছিল ধারালো অস্ত্র, যা দিয়ে নারীকে ভয় দেখানো হয়। অন্যজন ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। বাধা দিলে অস্ত্রধারী ব্যক্তি অস্ত্রের উল্টো দিক দিয়ে নারীকে কয়েকবার আঘাত করেন। লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে দুজন মোটরসাইকেলে করে পালায়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার শিকার নারী একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। তিনি সিলেটের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।
ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ
নগরে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশকে তৎপর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, সিলেট-৪ (গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীসহ সরকারদলীয় নেতারা।
তবে ছিনতাইয়ের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে ‘নেগেটিভভাবে’ প্রচার করার অভিযোগ এনেছে সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী। গত সোমবার সন্ধ্যায় মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি করেন। পুলিশ কমিশনার বলেন, সম্প্রতি ব্যক্তিগত কিছু বিরোধের ঘটনাকেও ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে প্রচার দেওয়া হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্লাউড সোর্সড অনলাইন ডেটাবেজের সূচক অনুযায়ী ক্রাইম ইনডেক্স ও সেফটি ইনডেক্স অনুযায়ী সিলেট মহানগর এলাকার জনগণের বসবাসের জন্য অত্যন্ত ভালো পর্যায়ে রয়েছে।






