বাজারে সোনালি মুরগির দাম বেড়ে গেছে। খুচরায় এক কেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৩০ টাকা দরে। গত এক মাসে কেজিতে অন্তত ১০০ টাকা দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণত ঈদের পর মুরগির দাম কমে যায়, কিন্তু এবার উল্টো হয়েছে। তবে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।

মুরগির খামারি, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা জানান, মুরগির বাচ্চা ও খাদ্যের দাম বাড়ায় অনেক খামারি মুরগি পালন কমিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া গত দুই–তিন মাসে রোগের আক্রমণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় মুরগি মারা যায়। ফলে খামারে সোনালি মুরগির উৎপাদন কমেছে। এ কারণে সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়েছেন। চলমান জ্বালানিসংকটও মূল্যবৃদ্ধিতে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে বলে তাঁরা জানান।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কল্যাণপুর নতুন বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও টাউন হল বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা দোকানে এক কেজি সোনালি মুরগির দাম ৪২০ থেকে ৪৩০ টাকা। পাড়ামহল্লায় তা ৪৫০ টাকায়ও বিক্রি হতে দেখা গেছে। কালারবার্ড নামে পরিচিত হাইব্রিড সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে ৩৮০–৪০০ টাকায়।

বিক্রেতারা জানান, রোজা শুরুর আগে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে প্রতি কেজি সোনালি মুরগি ২৮০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। ঈদের সপ্তাহখানেক আগে চাহিদা বেড়ে দামও বেড়ে ৩১০–৩৪০ টাকা হয়। ঈদের পর দাম কমার কথা, কিন্তু উল্টো বেড়েছে।

সরকারি সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এ সময়ের তুলনায় সোনালি মুরগির দাম ৫২ শতাংশ বেশি। গত এক মাসে দাম বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ।

খামারিদের দাবি, গত কয়েক মাসে মুরগির বাচ্চার দাম দেড় গুণের বেশি বেড়েছে। ৩০ টাকার বাচ্চার দাম এখন ৫০ টাকা। মুরগির খাবারের দামও কেজিতে দুই থেকে আড়াই টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া রোজার সময়ে রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক খামারে মুরগি মারা যায়।

উৎপাদনস্থলেই দাম বেশি

জয়পুরহাট, বগুড়া, নরসিংদী, খুলনাসহ কয়েকটি জেলায় সোনালি মুরগি বেশি উৎপাদন হয়। এসব জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এক–দুই দিনে উৎপাদনস্থলে ৩৩০–৩৫০ টাকা পাইকারি দরে সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে। ঢাকায় এসে খুচরায় তা ৪২০–৪৩০ টাকা বা তার বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। ঈদের আগে উৎপাদনস্থলে পাইকারি দাম প্রায় ১০০ টাকা কম ছিল।

খামারিদের দাবি, গত কয়েক মাসে মুরগির বাচ্চার দাম দেড় গুণের বেশি বেড়েছে। ৩০ টাকার বাচ্চার দাম এখন ৫০ টাকা। মুরগির খাবারের দামও কেজিতে দুই থেকে আড়াই টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া রোজার সময়ে রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক খামারে মুরগি মারা যায়।

বগুড়া জেলা পোলট্রি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান বলেন, খামারিদের লোকসান ও রোগের কারণে গত দুই–তিন মাসে খামারগুলোতে অস্বাভাবিকভাবে সোনালি মুরগির উৎপাদন কমেছে।

এসব কারণ থাকলেও দাম এতটা বাড়ার কথা নয় বলে অনেক বিক্রেতা জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে বড় বিক্রেতারা সোনালির দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।

বাজারে প্রায় দুই মাস ধরে সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট চলছে। কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেলের গায়ের মূল্য (এমআরপি) এখনো বাড়ায়নি। তবে ডিলার বা সরবরাহকারী পর্যায়ে বোতলজাত তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে বোতলের সয়াবিন তেল কিনতে ভোক্তাকে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

বেড়েছে চিনি, সয়াবিনের দাম

খুচরা দোকানে এক কেজি খোলা চিনির দাম এখন ১০০ থেকে ১০৫ টাকা। দুই সপ্তাহ আগে এটি ছিল ৯৫–১০০ টাকা। বিক্রেতারা জানান, পাইকারি পর্যায়ে বস্তাপ্রতি ২০০–২২০ টাকা দাম বেড়েছে। ফলে খুচরাতেও ৪–৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাজারে প্রায় দুই মাস ধরে সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট চলছে। কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেলের গায়ের মূল্য (এমআরপি) এখনো বাড়ায়নি। তবে ডিলার বা সরবরাহকারী পর্যায়ে বোতলজাত তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে ভোক্তাদের খরচ বেড়েছে।

বোতলের সয়াবিনের সংকটে অনেকে খোলা সয়াবিন তেল কিনছেন। কিন্তু খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও বেড়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুসারে, গত এক মাসে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম লিটারে ১০–১২ টাকা বেড়েছে।

বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল হাসেম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে কোম্পানিগুলো মিলগেটে চিনির দাম বাড়িয়েছে।

গত সপ্তাহে ১২ কেজির তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম একলাফে ৩৮৭ টাকা বেড়েছে। এর সঙ্গে সোনালি মুরগি, তেল, চিনি ও সবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম বাড়ায় চাপে রয়েছেন সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ।

সবজির দামও চড়া

এখন মৌসুম বদল হচ্ছে। বাজারে চিচিঙ্গা, বরবটি, ঢ্যাঁড়সের মতো গ্রীষ্ম মৌসুমের সবজি আসতে শুরু করেছে। সাধারণত এ সময় মৌসুমি সবজির দাম একটু বেশি থাকে। কিন্তু গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর দৈনিক ১৫টি সবজির বাজারদর প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় চিচিঙ্গার দাম কেজিতে ৪৫ শতাংশ বেশি। বেগুন, চালকুমড়া, বরবটির দাম প্রায় ৩০ শতাংশ; মিষ্টিকুমড়া, দেশি টমেটো, করলার দাম ১০–১৫ শতাংশ; ঢ্যাঁড়স, পটোল, লাউয়ের দাম ৭–৮ শতাংশ বেড়েছে। দাম কমেছে কাঁচা পেঁপে ও শসার এবং স্থিতিশীল আলু, গাজর ও কচুর লতির।

জ্বালানিসংকটের কারণে বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। গত সপ্তাহে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম একলাফে ৩৮৭ টাকা বেড়েছে। এর সঙ্গে সোনালি মুরগি, তেল, চিনি ও সবজির দাম বাড়ায় সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ চাপে রয়েছেন।