সরকারি কলেজের শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়া রেজাউল হারুন (৭০) এখন জীবনের শেষ পর্যায়ে বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করছেন। স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে দূরে রয়েছেন তাঁরা। গত ঈদ তিনি কাটিয়েছেন রংপুরের এক নির্জন বৃদ্ধাশ্রমে।

রেজাউল হারুনের গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার শাখাহাতী চরে। অবসরের পর তিনি রাজধানীর খিলগাঁওয়ের নিজস্ব ফ্ল্যাটে থাকতেন। তিন বছর আগে ছেলের প্রতি অভিমান করে সেই ফ্ল্যাট ছেড়ে রংপুরে চলে আসেন।

এখন তাঁর ঠিকানা রংপুর নগরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ময়নাকুঠি বকসা এলাকার সবুজাভ বকসা বৃদ্ধাশ্রম। আধা পাকা টিনশেডের জরাজীর্ণ ঘরে ২৫ জন নারী-পুরুষের সঙ্গে দিন যাপন করছেন তিনি। গত রোববার সেখানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়।

রেজাউল হারুন জানান, তাঁর বাবা রংপুর মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ছিলেন। শৈশব-কৈশোর কেটেছে রংপুরে। পড়াশোনা হয়েছে রংপুর উচ্চবিদ্যালয়ে, এরপর কারমাইকেল কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন।

শিক্ষাজীবন শুরু হয় রাজধানীর সরকারি বাঙলা কলেজে। পরে সরকারি তিতুমীর কলেজ ও সরকারি কবি নজরুল ইসলাম কলেজে শিক্ষকতা করেন।

অবসরের পর পরিবারের সঙ্গে ভালোভাবে সময় কাটছিল। খিলগাঁওয়ের গোড়ানে আলী আহমদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনের নিজের ফ্ল্যাটে সপরিবারে বাস করতেন। ছেলে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, মেয়ে এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কিন্তু কয়েক বছর আগে এক সকালে ঘটে যায় একটি ঘটনা, যা তাঁর জীবন বদলে দেয়।

স্মৃতি তুলে রেজাউল হারুন বলেন, ‘কয়েক বছর আগে আমার স্ট্রোক (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ) হয়; শরীর দুর্বল থেকে। ওই দিন শরীরটা ভালো লাগতেছিল না। আমার ওয়াইফ (আয়েশা রেজা) বলল, “একটু বাজারে যাওয়া লাগবে।” আমি বললাম, ছেলেকে টাকা দেও। ছেলে রুম থেকে বলতেছে, “আমি বাজারে যাব, আর তুমি বসে বসে খাবা?” এটা আমার সেন্টিমেন্টে খুব লাগছে। আমি আর কোনো কথা বলিনি। পরে বিকেলের বাসে উঠে সোজা রংপুর চলে এসেছি।’

রংপুরে এসে প্রথমে এরশাদনগরে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। পরে এক পরিচিতের মাধ্যমে এই বৃদ্ধাশ্রমের খোঁজ পান। বছরখানেক ধরে এখানে আছেন।

বৃদ্ধাশ্রমে থাকার পটভূমিতে ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনাও উল্লেখ করেন রেজাউল। তাঁরা তিন ভাই, চার বোন। ছোট ভাই জাপানে ছিলেন, গাইবান্ধায় এসে বাড়ি করেছিলেন। তিনি অসুস্থ হওয়ার পর ছোট ভাইও স্ট্রোক করেন। ছোট ভাই বাড়িতে গেলে অন্য ভাই ও বোন তাঁকে থাকতে দেননি। এরপর ছোট ভাই মারা যান। এই ঘটনা তাঁকে নাড়া দেয় এবং স্বজনদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়।

রেজাউলের স্ত্রী আয়েশা রেজা শয্যাশায়ী। ঢাকার ফ্ল্যাটটি স্ত্রীর নামে করে দিয়েছেন। ছেলে-মেয়ে সেখানে থাকেন। অবসরকালীন ভাতার টাকা স্ত্রীর কাছে দিয়েছেন। এখন মেয়ে মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠায়।

বৃদ্ধাশ্রমের জীবন নিয়ে তাঁর খুব আক্ষেপ নেই। ছাত্রজীবনে নকশালপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনে গ্রামে ঘুরে ভূমিহীন কৃষকদের বাড়িতে থাকতেন। তখন থেকেই এমন জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত।

এখন বই-পত্রিকা পড়ে এবং অন্যদের সঙ্গে গল্প করে সময় কাটান রেজাউল। পরিবার, বন্ধু বা স্বজনদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, ‘বন্ধুরা ডাকে, মেয়েও যেতে বলে। কিন্তু যাই না। মেয়ের সংসারে গিয়ে বিব্রত করতে চাই না। আমি এখন সুস্থ। বৃদ্ধাশ্রমে অসুস্থদের সেবা করে সময় কেটে যায়। এখানে সবার সঙ্গে ঈদ করেছি, কোনো কষ্ট হয়নি। এই জীবনটাই মেনে নিয়েছি।’

বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা রেজাউল করিম বলেন, সন্তানের অবহেলায় বাবা-মায়ের মনে যে হাহাকার তৈরি হয়, তা কখনোই পুরোপুরি মুছে যায় না। এখানে তাঁরা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু একা হলেই কষ্টটা ফিরে আসে। অনেকেই তখন কেঁদে ফেলেন।

রেজাউল ১৯৭৭ সালের এক ঘটনার স্মৃতি তুলে ধরেন। তখন কারমাইকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে আন্দোলন চলছিল। রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রংপুরে এলে আন্দোলনকারীরা সার্কিট হাউসে মিছিল নিয়ে যায়। তাঁকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ হয়। রেজাউল হারুন বলেন, ‘আমি প্রায় ১৭-১৮ মিনিট কথা বলি। বক্তব্যে প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করতে বলেছিলাম। তখন মোনাজাত ভাই (চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন) আমার পিঠে হাত দিয়ে বললেন, “হারুন সাহসের সঙ্গে বলে যাও।”’ তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন রংপুর জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানি।

নজরুল ইসলাম হক্কানি সেই আন্দোলনের সক্রিয় ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। তবে রেজাউলের বৃদ্ধাশ্রমে থাকার বিষয় জানতেন না। মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদকের কাছে বিষয়টি শুনে তিনি বলেন, ‘সমাজে আমরা দুই চিত্র দেখছি। একদিকে গ্রামের অনেক ছেলেমেয়ে নিজেদের বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য বাড়ি করে দিচ্ছেন; তাঁদের আয়ে মা, বাবা, আত্মীয়স্বজন বেঁচে আছেন। আরেকদিকে সন্তানদের কারণে বাড়ি ছাড়ছেন বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা। বিয়ের পর অনেক ছেলেমেয়ের মানবিক মূল্যবোধের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।’