ঘুম ভাঙার পর চোখ খুললে আপনারা প্রথম কী দেখেন? আমি দেখি একটা বিশাল ক্যাকটাস। অনেক বছর আগে একদিন তার একটা ডাল ধুপ করে আমার মাথার ওপর পড়ে এসেছিল। হাজার কাঁটাযুক্ত কচি সবুজ ডাল—লোকমুখে জিনের বাসা। তার নির্জনতা আমার ভালো লাগে। পুরোনো স্যাঁতসেঁতে একটা বাড়ির পেছনে পরিত্যক্ত মাটিতে বেকায়দায় দাঁড়িয়ে থাকে সে। মরচে ধরা ঝুরঝুরে বেড়া দিয়ে বাইরের জগতের সঙ্গে তার সীমানা আঁকা। এর মধ্যে ক্যাকটাস ছাড়াও আছে একটা বন্ধ্যা কাঁঠালগাছ, নুয়ে পড়া আতাগুল্মে ঝুলন্ত ভাঙা দোলনা আর মাটি খুঁড়ে বাস করে কানকাটা নেউল। আমিও এই ইকোসিস্টেমেরই একজন। তাদের সঙ্গে বসে থাকি সকাল, দুপুর বা রাতে। আকাশের দিকে তাকালে সময় বুঝতে পারি না। রাত আর দিনের পার্থক্য করতে পারি না। চাঁদ আর সূর্য আমার কাছে একই রকম দেখায়।

দাদি যখন প্রথম খেয়াল করেন, আমি আলো-আঁধারের তফাত বুঝি না, তখন তিনি বিশেষ বিচলিত হয়নি। তার ধারণা ছিল, অপুষ্টির কারণে এই শিশু কালা-বোবা-বোবা যেকোনো কিছু হতে পারে। যা আছি, তাই মন্দের ভালো। কেউ আমাকে বিশেষ ঘাঁটাত না। আমি একা ঘুরে বেড়াতাম পাড়ায়। সেভাবেই একদিন আবিষ্কার করি রংচটা বাড়িটা।

সম্ভবত তখন দুপুর, কারণ গাছগুলো ঝিম ধরে ছিল। অধিক পেকে পচা কোনো বুনো ফলের কড়া গন্ধ অনুসরণ করে বেড়া ডিঙিয়ে সেই বাড়ির পেছনে চলে আসি। প্রথমে ডানদিকে কাত হয়ে থাকা ভাঙা দোলনা আকর্ষণ করে। পরক্ষণে বিশাল ক্যাকটাসের দিকে চোখ আটকে যায়। এমন গাছ আগে দেখিনি। ক্যাকটাসটাকে চরকি ঘুরে ঘুরি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা মোটা ডাল ঘাড়ের ওপর পড়ে পিঠ চিরে যায়। চোখ বুজে একদৌড়ে বাড়ি ফিরি।

আঘাতের শাস্তি হিসেবে পরদিন সকালে আমাকে ধরে স্কুলের ভ্যানে তুলে দেওয়া হয় অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে। তখনো বাঁ হাত মাথার ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে ডান কান ধরতে পারতাম না। কিন্তু সব দুষ্টু বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানো দরকার—দাদি বলতেন। আমি বিনা বাক্যে স্কুল যেতে শুরু করি। স্কুলে শিখি, দিন-রাতের পার্থক্য ছাড়াও অনেক কিছু বুঝি না। সবাই একই ভাষায় কথা বললেও আমি অন্যদের কথা কম বুঝতাম। কারণ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা নতুন বাক্যে চলে যেত। শব্দের স্রোতে মাথায় চিনচিনে ব্যথা হতো। শক্ত করে চোখ বুজতাম। তখন দেখতাম কাঁটাযুক্ত নির্বাক কচি সবুজ গাছটাকে। হাত বাঁকিয়ে ঘাড়-পিঠের ক্ষত ধরার চেষ্টা করতাম। খসখসে স্পর্শে মনে হতো, কাঁটা এখনো শরীরে বিঁধে আছে। গাছের প্রতি তীব্র টান অনুভব করতাম। স্কুল শেষে বাড়িটার আশপাশ ঘুরতাম। কিন্তু কাছে গেলে অজানা ভয়ে বেড়া ডিঙোতাম না। দূর থেকে দেখতাম, বাড়ির চারপাশ আবর্জনায় ঢেকে যাচ্ছে—ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, বেলুন, অন্তর্বাস, মুরগির পা। যত দিন যায়, বাড়িটা পুরোনো, অগোছালো, অস্পৃশ্য আর আকর্ষণীয় হয়।

জামাকাপড় পরে স্কুল যাওয়া আর ফিরে ধুলো মোছা ছিল রোজকার রুটিন। এভাবে অনেক সময় কেটে যায়। আমি সবার চেয়ে লম্বা হয়ে যাই। মুখভর্তি দাড়ি-লম্বা চুল ঘাড়ের ক্ষত ঢেকে দেয়। নড়বড়ে দাঁত হারিয়ে দাদি ফোকলা বুড়ি হয়ে যান। স্কুলে যাওয়ার পরও কোনো ক্লাসে পাস করি না। ঘুরেফিরে একই ক্লাস করে যাই। ছুটিতে লাইব্রেরিতে ব্যাকরণ পড়ানো হতো। এভাবে চলছিল। কিন্তু একদিন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে কেঁচোয়গেট ধরতেই মনে হয়, জীবন রাতারাতি বদলে গেছে। সানসেটের ওপর কাকের দল নিঃশব্দে চেয়ে ছিল। তাদের দৃষ্টি এড়াতে দ্রুত ঘরে ঢুকি। নিত্যদিনের প্রলাপের সুর কানে আসে না। হিমশীতল মোজাইক আমার পা চেপে ধরতে চায়। বড় ঘর, পাকঘর ঘুরে বাথরুমে উঁকি দিই। দেখি, ফোকলা দাদি মরে পড়ে আছেন। বুঝতে সময় নিই, কী করব? মৃতদেহ গোসল করাবে কে, কবর দেবে কে? আমি ছাড়া দাদির কেউ নেই। কিন্তু মড়াবাড়ির খবর জানাজানি হলে জানি, দাদির দুই ছেলে-নাতিপুতি আছে, তারা দেশের বাইরে থাকে। খবর পেয়ে তারা ফিরে আসে। তখন জানি, আমি তাদের রক্তের সম্পর্কের কেউ নই।

দাদির আপনজনরা ফিরে বাড়ি রমরমা হয়। আনুষ্ঠানিকতার মাঝে তাদের কথা বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর পাই না। নিজের অক্ষমতায় আফসোস হয়। পনেরো বছর আগে দাদি আমাকে কোথা থেকে এনেছিলেন, জানতে পারি না। নতুন মানুষরা আমাকে প্রশ্ন করে। গুঞ্জনে মাথার শিরা জট পাকায়। একদিন সবাই ঘুমিয়ে যখন, জানালা ভেঙে পালাই। কোথায় যাব ভাবতে ভাবতে চোখ বুজে দেখি ক্যাকটাসের প্ররোচনা। এবার ডাক অগ্রাহ্য করি না। ময়লা পেরিয়ে বেড়া ভেঙে তার কাছে আসি।

তারপর থেকে এখানে বাস। প্রথমে সমস্যা হলেও মাটি খেয়ে বেঁচে থাকা বুঝে জীবন সহজ হয়। গর্ত করে ঘর বানাই। সময়ের সঙ্গে জায়গা আরামদায়ক হয়। একবার শুয়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। ক্যাকটাস অদূরে দাঁড়িয়ে। চোখ খুললেই দেখি। তার ডাল ছায়া ফেলে বুকে। নেউলরা উঁকি দেয়। ভ্রমর, মথ, আঠালো পোকা ঘুরে বেড়ায়। শরীরের চামড়া শুকিয়ে খসখসে হয়। তাদের সাহস বাড়ে। হাত-পা-বুকে উঠে কামড়ায়। আমি স্থির হয়ে যাই। পিঠের ক্ষতে শিকড় জন্মে ভূমি আঁকড়ে ধরে। মাটির কম্পনে হৃৎস্পন্দন বিলীন হয়। মাথার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাই। শ্বাস শান্ত হয়। বাড়ি আমাকে আপন করে নেয় অথবা চিরকাল আমার ছিল। কাউকে বোঝাতে না পারার দুঃখ ঘুচে যায়। বুঝি, সে আমাকে ছুঁচ্ছে, কথা বলছে। প্রথমে পিঠে সুঁইয়ের মতো বিঁধত। ধীরে ধীরে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নেয় আমাকে আর জবাব দিয়ে যায় আমার সকল প্রশ্নের—

দাদি আমাকে ঠিক এই মাটি থেকেই তুলে নিয়ে গিয়েছিল।

এখানেই আমার জন্ম।