ইরানে ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের দ্বিতীয় ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অভিযানে কয়েক ডজন সামরিক উড়োজাহাজ এবং কয়েকশো কমান্ডো অংশ নিয়েছিল বলে গতকাল রোববার জানান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এটিকে মার্কিন ইতিহাসের ‘সবচেয়ে দুঃসাহসিক অভিযান’ আখ্যা দিয়েছেন।
তবে ইরান দাবি করেছে, এই অভিযান ব্যর্থ হয়েছে এবং উদ্ধার অভিযানে দুটি মার্কিন সি-১৩০ উড়োজাহাজ ও দুটি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ধ্বংস করা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, চাকা আটকে যাওয়া উড়োজাহাজ দুটি তাদের সেনারাই ধ্বংস করেছে।
এদিকে, যুদ্ধবিরতির চুক্তি এবং হরমুজ প্রণালী খোলার জন্য ইরানকে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সময় মঙ্গলবার রাত আটটা (ইস্টার্ন টাইম) চূড়ান্ত সময়। এর মধ্যে রাজি না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলো ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তেহরান এই হুমকিকে ‘যুদ্ধাপরাধের উসকানি’ বলে মন্তব্য করেছে। উত্তেজনা কমাতে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন মধ্যস্থতাকারীরা।
হুমকির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান নিজেদের পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় হামলার জবাবে ইসরায়েলের পাশাপাশি বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন কোম্পানির পেট্রোকেমিক্যাল, তেল ও গ্যাস স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। ইসরায়েলের হাইফায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি ভবন ধসে পড়েছে। ইসরায়েল ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই চলছে; ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের এক সেনা নিহত হয়েছেন।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ষষ্ঠ সপ্তাহ চলছে। গত শুক্রবার ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষার আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল ভূপাতিত হয়। সেদিন পাইলটকে উদ্ধারের দাবি করলেও ‘ওয়েপন সিস্টেম অফিসার (ডব্লিউএসও)’ নিখোঁজ হন। তাঁকে উদ্ধারে একটি এ-১০ ওয়ারথগ ভূপাতিত হয় এবং দুটি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে চাপে পড়েন ট্রাম্প, কারণ নিখোঁজ কর্মকর্তা ধরা পড়লে তেহরান দরকষাকষিতে ব্যবহার করতে পারত।
শনিবার উদ্ধার নিয়ে তেমন কিছু না বললেও রোববার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, দ্বিতীয় ক্রু উদ্ধার হয়েছে। তিনি বলেন, উদ্ধারকৃত কর্মকর্তা কর্নেল পদমর্যাদার। মার্কিন বাহিনী ২৪ ঘণ্টা তাঁর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে সাত ঘণ্টার সতর্ক অভিযানে ইরানের পাহাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধার করে।
ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁকে ফিরিয়ে আনতে মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অস্ত্রে সজ্জিত কয়েক ডজন সামরিক উড়োজাহাজ পাঠিয়েছিল। তিনি কিছু আঘাত পেয়েছেন, তবে তিনি দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠবেন।’
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি বলেছেন, ‘মার্কিন যুদ্ধবিমানের দুই ক্রুকে উদ্ধারে চালানো অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সি-১৩০ সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজ এবং দুটি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ধ্বংস করা হয়েছে। দক্ষিণ ইসফাহানের একটি পরিত্যক্ত বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ধোঁকাবাজি ও পলায়নের অভিযান পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে।’ তাসনিম সংস্থা ইসফাহানের দক্ষিণে পুড়তে থাকা উড়োজাহাজের ছবি প্রকাশ করেছে। সিবিএস নিউজ মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, উড়োজাহাজগুলো উড়্য়ন ব্যর্থ হওয়ায় নিজেরাই ধ্বংস করা হয়েছে।
ট্রাম্প গতকাল ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘মঙ্গলবার, রাত আটটা ইস্টার্ন টাইম!’ এতে তেহরান সময় বুধবার রাত সাড়ে ৩টা, জিএমটি মঙ্গলবার রাত ১২টা [বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৬টা]। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর তেহরান হরমুজ বন্ধ করে দিয়েছে। আগে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
আরেক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, হরমুজ না খুললে ইরানকে ‘নরকের’ স্বাদ নিতে হবে। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘তারা (ইরান) যদি দ্রুত কোনো চুক্তিতে না আসে, তবে আমি সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে দেশটির তেলসম্পদ দখল করার কথা বিবেচনা করছি।’ তিনি বলেন, ‘শিগগিরই আপনারা দেখবেন, ইরানজুড়ে সেতু আর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধসে পড়ছে।’ ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানি কর্মকর্তারা আলোচনায় আছেন এবং সোমবারের মধ্যে চুক্তির ‘ভালো সম্ভাবনা’ রয়েছে। তাঁর জামাতা জারেড কুশনার ও দূত স্টিভ উইটকফ ইরানিদের সঙ্গে কথা বলছেন, যদিও ইরান নাকচ করে আসছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ‘একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করার হুমকি দেওয়া মানে আপনি গোটা জনগোষ্ঠীকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চান। এটা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের চেয়ে কম কিছু নয়।’ এক্সে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘আপনার বেপরোয়া পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি পরিবারকে নারকীয় পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নেতানিয়াহুর আদেশ মানতে গিয়ে আপনার জেদের কারণে আমাদের পুরো অঞ্চল এখন আগুনে পুড়তে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোনো ভুল করবেন না; যুদ্ধাপরাধের মাধ্যমে আপনি কিছুই হাসিল করতে পারবেন না। এ পরিস্থিতির একমাত্র প্রকৃত সমাধান হলো, ইরানি জনগণের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং এই বিপজ্জনক খেলা বন্ধ করা।’
মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি গতকাল স্টিভ উইটকফ, আব্বাস আরাগচি প্রমুখের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। রাশিয়ার সের্গেই লাভরভ ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপের ভাষা এড়াতে বলেছেন। চীনের ওয়াং ই বলেছেন, যুদ্ধবিরতি হরমুজ স্বাভাবিক করার মূল উপায়। ওমান-ইরান উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসে পরিকল্পনা উত্থাপন করেছে।
ইসরায়েল গতকাল বলেছে, আগের দিন ইরানের ১২০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে, বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও উৎক্ষেপণে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পেট্রোকেমিক্যালে হামলার কথা বলেছেন। ইরানের আর্মি এয়ার ডিফেন্স কলেজের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ জারে নিহত হয়েছেন।
জবাবে ইরান হাইফা তেল শোধনাগার ও দক্ষিণ কারখানায় হামলা করেছে; হাইফায় ভবনে আঘাতে ২৪ জন আহত, একজন গুরুতর, তিনজন আটক পড়ার আশঙ্কা। আমিরাতের বোরোজ পেট্রোকেমিক্যাল, খোর ফাক্কান জাহাজ, বাহরাইনের গালফ পেট্রোকেমিক্যালস ও বাপকো, কুয়েত পেট্রোলিয়ামে হামলা হয়েছে। ইরাকে তেল মজুতেও আঘাত। সৌদি আরব ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন প্রতিহত করেছে।






