ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এক মাস ধরে জ্বালানি তেল নিয়ে চর্চা চলছে চতুর্দিকে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল কিনতে লম্বা লাইনের ছবি ও খবর প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে অনেক জায়গায় নোটিশ ঝুলছে—‘অকটেন নেই’, ‘পেট্রল নেই’, ‘ডিজেল নেই’। গাড়ির মালিক না হলেও সবাইকে এখন অকটেন-পেট্রলের খবর রাখতে হচ্ছে, কারণ যানবাহনে চড়তেই হয়।

নাম ভিন্ন হলেও পেট্রল ও অকটেন মূলত একই ধরনের জ্বালানি। উন্নতমানের পেট্রলকেই অকটেন বলা হয়। জ্বালানিতে অকটেন রেটিং দেখে এর গুণগত মান বোঝা যায়। উচ্চমানের মোটর গ্যাসোলিনে অকটেন রেটিং বেশি থাকে, যাকে অকটেন বলে। মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসে সাধারণত অকটেন ও পেট্রল ব্যবহার হয়।

জ্বালানিতে অকটেন রেটিং যত বেশি, ইঞ্জিন তত বেশি চাপ সহ্য করতে পারে। তাই পেট্রলচালিত গাড়িতেও অনেকে অকটেন ব্যবহার করেন, বিশেষ করে মোটরসাইকেলে এটি সাধারণ। অকটেনের গাড়ি কি পেট্রলে চালানো যায়, চালালে কী ক্ষতি?

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৪ লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। গড়ে দৈনিক বিক্রি ১ হাজার ১৩৭ টন। তবে বিভিন্ন সময়ে এটি বাড়ে-কমে। গত বছরের মার্চে গড়ে দিনে ১ হাজার ১৯৩ টন বিক্রি হয়েছে। এবারের মার্চে দৈনিক গড় ১ হাজার ২২২ টন। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর দৈনিক বিক্রি বেড়েছে গড়ে ২৯ টন।

দেশে বছরে সরবরাহকৃত মোট জ্বালানি তেলের ৬ শতাংশ অকটেন। চাহিদার অর্ধেক অকটেন দেশে উৎপাদিত হয়। বিপিসির তথ্য বলছে, গত অর্থবছর চাহিদার ৫০ শতাংশ অকটেন দেশে উৎপাদিত হয়েছে, বাকি ৫০ শতাংশ আমদানি করা হয়েছে।

দেশে অকটেন তৈরি হয় বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া উপাদান ও আমদানিকৃত কনডেনসেট শোধন করে। সরকারি জ্বালানি তেল শোধনাগার একসময় অকটেন তৈরি করলেও এখন আর সেখান থেকে পাওয়া যায় না। তবে বিপিসি নিয়মিত চট্টগ্রামের সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড, পারটেক্স পেট্রো লিমিটেড, নরসিংদীর অ্যাকোয়া রিফাইনারি লিমিটেড ও বাগেরহাটের পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড—এই চারটি বেসরকারি শোধনাগার থেকে অকটেন কেনে। এছাড়া সরকারি গ্যাস কোম্পানির নিজস্ব ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট থেকেও অকটেন পায় বিপিসি।

আমদানিকৃত অকটেনের জাহাজ সাধারণত ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর আসে। গত মার্চে অকটেন নিয়ে কোনো জাহাজ আসার কথা ছিল না। জরুরি পরিস্থিতিতে বাড়তি এক জাহাজ অকটেন কেনার সিদ্ধান্ত হলেও তা মার্চে আসেনি। এর মধ্যে বাড়তি বিক্রির কারণে মজুত কমে এসেছে।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুসারে, ১ এপ্রিল পর্যন্ত অকটেনের মজুত ৯ হাজার ২১ টন। দৈনিক বিক্রির হিসাবে এটি ৭ দিন চলার কথা। ৬ এপ্রিল ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে ভিটল এশিয়ার একটি জাহাজ আসবে। মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আরও ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ আসার কথা।

বিপিসি সূত্র জানায়, আমদানির পাশাপাশি এ মাসে বেসরকারি শোধনাগার থেকে ৩০ হাজার টন অকটেন পাওয়া যাবে। অর্থাৎ এপ্রিলে মোট ৭০ হাজার টন অকটেন যুক্ত হবে, যেখানে চাহিদা ৩৭ হাজার টন। তাই আপাতত অকটেনের ঘাটতির কোনো আশঙ্কা নেই।

বিপিসির হিসাবে অকটেনের সংকট নেই। তবু ফিলিং স্টেশনগুলোতে লাইন কমছে না, যা আগে দেখা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট বক্তারা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ‘প্যানিক বায়িং’ (ভীতি থেকে বাড়তি কেনা) শুরু হয়। একশ্রেণির গোষ্ঠী এটিকে সুযোগ করে বাড়তি কিনে মজুত করে।

গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে অভিযান চালিয়ে প্রশাসন ২৮ হাজার ৯৩৮ লিটার অকটেন উদ্ধার করেছে।

আতঙ্কজনিত কেনাকাটা এখনো চলছে বলে ফিলিং স্টেশনগুলো অতিরিক্ত চাহিদা সামলাতে পারছে না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। তাঁরা বলছেন, এপ্রিলে সরবরাহ বাড়লে ভিড় কমতে পারে। অনেকে এপ্রিলে দাম বাড়ার ভয় করেছিল, কিন্তু সরকার দাম বাড়ায়নি। এতে মজুত করার প্রবণতা কমতে পারে।