কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একসময় কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার বৈষম্য দূর করার শক্তিশালী হাতিয়ার বলে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু এখন এই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার উল্টো প্রজন্মগত বিভাজনকে আরও গভীর করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণ ও অভিজ্ঞ কর্মীদের মধ্যে এআই ব্যবহারের ফারাক ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রের সহযোগিতা ও নেতৃত্ব কাঠামোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের (এলএসই) ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করছেন জেন-জি কর্মীদের ৮৩ শতাংশ এবং মিলেনিয়ালদের ৭৩ শতাংশ। তবে জেন-এক্স কর্মীদের মধ্যে এই হার ৬০ শতাংশ এবং বেবি বুমারদের মধ্যে মাত্র ৫২ শতাংশ। ফলে প্রজন্মভিত্তিক প্রায় ৩০ শতাংশের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

একই প্রযুক্তি, ভিন্ন ব্যবহার

এই ব্যবধান শুধু ব্যবহারের সংখ্যায় নয়, ব্যবহারের ধরনেও স্পষ্ট। ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান ২০২৫ সালের এআই সম্মেলনে বলেন, ‘বড়রা সাধারণত চ্যাটজিপিটিকে গুগলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন। ২০ থেকে ৩০ বছরের কর্মীরা এটিকে জীবন বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সহকারী হিসেবে দেখেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এআইকে পুরো একটি অপারেটিং সিস্টেমের মতো ব্যবহার করছে।’

তরুণেরা বেশি ঝুঁকছেন এআইয়ের দিকে

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তরুণদের এআইয়ের প্রতি আকর্ষণের পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। এলএসই জরিপে দেখা গেছে, সাম্প্রতিককালে এআই-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ পাওয়ার ক্ষেত্রে জেন-জি কর্মীরা অন্য প্রজন্মের তুলনায় এগিয়ে। এমন প্রশিক্ষণ পাওয়া কর্মীরা এআই ব্যবহারে বেশি আগ্রহী, যা ইঙ্গিত দেয় যে যথাযথ প্রশিক্ষণে বয়স্ক কর্মীরাও দ্রুত এআই গ্রহণ করতে পারেন।

কাজের ধরনও একটি কারণ। প্রারম্ভিক ও মধ্যম স্তরের চাকরিতে লেখালেখি, বিশ্লেষণ ও রুটিন কাজ বেশি, যা এআই দিয়ে সহজে সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু সিনিয়র লেভেলে সম্পর্ক গড়ে তোলা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও টিম ম্যানেজমেন্টের মতো মানবিক দক্ষতা বেশি দরকার।

ক্যারিয়ারবিশেষজ্ঞ কিম লিয়ার বলেন, এআই-নির্ভর ভবিষ্যতের কথা শুনে জেন–জি কর্মীদের মধ্যে ‘ক্যারিয়ারের শুরুতেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ভয়’ কাজ করছে। ফলে তারা দ্রুত এআই শিখতে চাইছেন। তবে এই আগ্রহের পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। ২০২৫ সালের গ্যালাপ জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৫৩ শতাংশ জেন–জি এআই নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর মাত্র ২৬ শতাংশ আশাবাদী। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই-প্রভাবিত পেশায় ২২-২৫ বছর বয়সী কর্মীদের কর্মসংস্থান ১৬ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

সহকর্মীর বদলে এআই-সহযোগিতার সংকট

ট্যালেন্টএলএমএসের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক জেন–জি কর্মী কাজসংক্রান্ত প্রশ্নে সহকর্মী বা ম্যানেজারের পরিবর্তে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছেন। অনেকে মনে করেন, এআই তাদের ম্যানেজারের চেয়ে ভালো নির্দেশনা দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি হয়তো পর্যাপ্ত মেন্টরশিপের অভাব বা কর্মক্ষেত্রে মানসিক নিরাপত্তার ঘাটতির লক্ষণ। অনেক তরুণ কর্মী প্রশ্ন করলে অদক্ষ মনে হওয়ার ভয় পান, তাই এআই তাদের জন্য ‘নিরাপদ বিকল্প’ হয়ে উঠছে।

সমাধানটা কী

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাধান হতে পারে ‘ইন্টারজেনারেশনাল পার্টনারশিপ’, অর্থাৎ তরুণ ও অভিজ্ঞ কর্মীদের একসঙ্গে কাজ করানো। এতে তরুণরা এআই দক্ষতা দিয়ে কাজের গতি বাড়াবেন, আর জ্যেষ্ঠরা সেই আউটপুট যাচাই করে প্রেক্ষাপট, কৌশল ও মূল্যবোধ যোগ করবেন। এলএসই জরিপ অনুযায়ী, প্রজন্মগতভাবে বৈচিত্র্যময় এআই টিমগুলো কম বৈচিত্র্যময় টিমের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি উৎপাদনশীল। তথ্যসূত্র: বিল্ডইন