একসময় শুক্রবার বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত শত শত মানুষের কোলাহলে মুখরিত ছিল মৌলভীবাজারের মঙ্গলচণ্ডীর বাজার। দূর থেকে অন্ধকারেও এর আলো চোখে পড়ত। কিন্তু এখন এই প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো হাটে আর সেই জৌলুশ নেই।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের শ্রীবাউর এলাকায় অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী বাজারে এখন হাটবারেও ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় দেখা যায় না। অবকাঠামো ঠিকঠাক থাকলেও মানুষের উপস্থিতি নেই। শুধু চায়ের দোকানসহ কয়েকটি স্থায়ী দোকানে এটি টিকে আছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য, কৃষি উপকরণ এবং হাওরের মাছ কেনাবেচার কেন্দ্র ছিল এটি। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার বিকেলে জমে উঠত হাট, যা চলত প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত।
সবজি উৎপাদন কমে যাওয়া, কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি, বাঁশ-বেতের উপকরণের চাহিদা হ্রাস এবং হাওরের মাছ কমে যাওয়ায় গত এক দশকে হাটটি ক্রমশ জৌলুশ হারিয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, সাপ্তাহিক হাটবার হলেও পুরো এলাকা সুনসান। কোনো ক্রেতা-বিক্রেতা নেই, পণ্য নিয়ে আসেননি কেউ। হাটের টিনশেড ও উন্মুক্ত পাকা স্থান ফাঁকা পড়ে আছে। পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ পাশের বেশিরভাগ দোকান বন্ধ। পূর্বদিকে একটি চায়ের দোকান ও একটি মুদিদোকান খোলা, সেখানে কয়েকজন বসে আছেন।
হাটে বর্তমানে একটি ওষুধের দোকান, চায়ের দোকানসহ ছয়-সাতটি স্থায়ী দোকান আছে। এগুলোও নিয়মিত খোলা থাকে না। দোকানিরা সুবিধামতো সময়ে দোকান খোলেন। হাটের উত্তর পাশে একটি মন্দির এবং দক্ষিণ পাশে মোস্তফাপুর ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রীবাউর গ্রামের মিরাশদার যতীন্দ্র মোহন কর প্রায় ২০০ বছর আগে এই বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে নাম ছিল ‘বাবুর বাজার’। পরে একটি পুকুর খননের সময় মাটির নিচ থেকে একটি মূর্তি পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবারের সঙ্গে মিলিয়ে নাম হয় ‘মঙ্গলচণ্ডীর বাজার’। তখন আশপাশে আর কোনো বাজার ছিল না, উন্নত সড়ক যোগাযোগও গড়ে ওঠেনি। কয়েক মাইল দূরের গ্রাম থেকেও মানুষ এসে পণ্য বিক্রি-ক্রয় করতেন। জগৎসী, মাড়কোনা, বাহারমর্দান, গয়ঘর, ভুজবল, আজমেরু, দজবালি, বাউরঘরি, কমলাকলস, ছিকিরাইলসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসতেন লোকজন।
দুপুরের পর থেকে শুরু হতো আনাগোনা। কেউ খেতের ফসল, কেউ লাঙল-জোয়াল, ঝাঁকা-টুকরি বা খালুই আনতেন। অনেকে খাবারের পসরা সাজাতেন। কাছের হাইল হাওর থেকে মৎস্যজীবীরা তাজা মাছ নিয়ে আসতেন। শত শত মানুষের ভিড়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত বাজার। স্থানীয়রা জানান, বিদ্যুৎ বা উন্নত সড়ক না থাকলেও রাত ১০-১১টা পর্যন্ত কেনাবেচা চলত। এই শতকের দেড় দশক আগ পর্যন্ত হাট ভালোভাবে চলত। তবে ২০১৫ সালের পর সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় জেলা শহরে যাতায়াত সহজ হয়। ফলে স্থানীয়রা শহরমুখী হয়ে পড়েন। কৃষি উৎপাদন ও হাওরের মাছ কমায় হাটের গুরুত্ব কমে।
শ্রীবাউর গ্রামের বাসিন্দা জিলদু মিয়া বলেন, আগের মানুষদের কাছ থেকে যতটুকু শোনা গেছে, ২০০ বছরেরও বেশি হবে এই বাজারের বয়স। বাজারটিতে অনেক দূরের গ্রাম থেকে মানুষ আসতেন। ক্রেতা-বিক্রেতার অভাবে বাজারটি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেলে ২০২১ সালের দিকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ কিছু ব্যক্তি পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেন। মাস দু-এক চলে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এখন কিছু স্থায়ী দোকান চলে।
ভুজবল গ্রামের জুনেদ আবেদীন বলেন, ‘বাজারটি জমজমাট থাকার সময় আমাদের বাড়ি থেকেও শব্দ শোনা যেত। মানুষের কথাবার্তায় শামশাম (গমগম) করত বাজার। সন্ধ্যার পর দূর থেকেও অন্ধকারে বাজারের বোমার (কুপি বাতি) আলো দেখা গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আসলে এলাকায় আগে যারা শাকসবজি উৎপাদন করত, তাদের অনেকেই বিদেশ চলে গেছে। পেশা বদলে ফেলেছে। হাওরে মাছও এখন আগের মতো পাওয়া যায় না। এসব কারণে গ্রামের রাস্তাঘাট ভালো হওয়ায় মানুষ বাজার করতে শহরে চলে যায়। সাপ্তাহিক হাটে আর মানুষ আসে না। দু-একবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের অবস্থা আর ফিরে আসেনি।’
বর্তমানে হাটটি আগের মতো প্রাণবন্ত না হলেও স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে এটি জীবন্ত। ‘মঙ্গলচণ্ডীর বাজার’ নামটি এখনো মুখে মুখে ঘোরে। অনেকেই মনে করেন, যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া গেলে এই ঐতিহ্যবাহী হাট আবার গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।






