আজকের সময়ে জ্বালানি সাশ্রয় শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, জাতীয় স্থিতিশীলতার অপরিহার্য শর্ত। তেল-গ্যাস নির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানির সঠিক ব্যবহার না হলে শিল্প, পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন সব ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়। এ কারণে জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তবে এই নীতি বাস্তবায়নে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠগ্রহণকে বিপর্যস্ত করে।
শিক্ষা একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। এক প্রজন্মের শিক্ষা ব্যাহত হলে তার প্রভাব ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি জাতীয় অগ্রগতিতেও দীর্ঘমেয়াদে পড়ে। তাই জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষায় ঠেলে দেওয়া অত্যন্ত অদূরদর্শী হবে। বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পাঠ্যপুস্তকের সমন্বয়ে যে স্বাভাবিক ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তা পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
করোনাকালে অনলাইন শিক্ষা ছিল জরুরি বিকল্প। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা আমাদের স্পষ্ট করে দেখিয়েছে এর গভীর সীমাবদ্ধতা। দেশের বিপুল শিক্ষার্থী প্রযুক্তিগত সুবিধা, স্থিতিশীল ইন্টারনেট, উপযুক্ত ডিভাইস ও অনুকূল পারিবারিক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ সবার জন্য সমান ছিল না। এতে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য বেড়েছে, অনেক শিক্ষার্থী পাঠে অনাগ্রহী হয়েছে, শেখার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও অনলাইনে সমানভাবে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেননি। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর মনোযোগ, অংশগ্রহণ, দুর্বলতা ও মানসিক অবস্থা সহজে বোঝা যায়, কিন্তু অনলাইনে তা অনেকাংশে সীমিত। শিক্ষা কেবল তথ্য আদান-প্রদান নয়, এটি আন্তঃক্রিয়াশীল, মানবিক ও মূল্যবোধনির্ভর প্রক্রিয়া। মুখোমুখি যোগাযোগ, তাৎক্ষণিক প্রশ্নোত্তর, সহপাঠীসঙ্গ, শৃঙ্খলা ও শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ—এসব শিক্ষার অপরিহার্য উপাদান অনলাইনে দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই জ্বালানি সাশ্রয়ের পরিকল্পনায় শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আলাদা বিবেচনা করা জরুরি। বিদ্যুৎ অপচয় রোধ, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা কমানো, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাশ্রয়ী নীতি, শিল্পকারখানায় দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার—এসব বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা কোনো টেকসই সমাধান নয়। এতে সাময়িক সাশ্রয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে জাতি বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
এক রাষ্ট্রের জন্য জ্বালানি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিক্ষিত, দক্ষ ও সচেতন নাগরিক গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানিসংকট সাময়িক হতে পারে, কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি প্রায়ই অপূরণীয়। তাই সংকটকালেও বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান সচল রাখা আবশ্যক। শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানমুখী রাখা মানে শুধু পড়াশোনা নিশ্চিত করা নয়, তাদের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক বিকাশের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
সারাংশে বলা যায়, জ্বালানি সাশ্রয় অবশ্যই জরুরি; তবে বাস্তবায়নে শিক্ষাব্যবস্থাকে পরীক্ষাগার বানানো যাবে না। যত কঠিন সংকটই আসুক, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অপরিহার্য। কারণ এক জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ হলো শিক্ষাব্যবস্থাকে স্বাভাবিক, কার্যকর ও অবিচ্ছিন্ন রাখা।
লেখক: জনসংযোগ বিভাগের প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ






