ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। ইরানের দাবি, এটি মার্কিন বাহিনীর অত্যাধুনিক এফ-৩৫ মডেলের যুদ্ধবিমান। যদিও বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, যুদ্ধবিমানটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল মডেলের।

ভূপাতিত যুদ্ধবিমানটিতে থাকা পাইলটের অবস্থা নিয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা একজন পাইলটকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। ইরানের পক্ষ থেকে ওই পাইলটকে আটক বা হত্যা করতে পারলে ‘বিশেষভাবে সম্মানিত করা’ হবে বলে জানানো হয়েছে।

শত্রুদেশের ভূখণ্ডে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে পাইলটরা নিজেদের বাঁচাতে আসলে কী করেন? কীভাবে লুকিয়ে থেকে রক্ষা পান? তাঁদের মনের অবস্থা কেমন হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিউস্টন ক্যান্টওয়েল। তিনি বর্তমানে মিচেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যারোস্পেস স্টাডিজে কর্মরত।

ঘটনার সময় পাইলটের মনের অবস্থা সম্পর্কে হিউস্টন বলেন, ‘তখন আপনার মনে হবে, হায় ঈশ্বর, দুই মিনিট আগেও আমি যুদ্ধবিমানটিতে ছিলাম। ঘণ্টায় ৫০০ মাইল গতিতে উড়ছিলাম। এরপর একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরিত হলো। আক্ষরিক অর্থেই মাথা থেকে মাত্র ১৫ ফুট দূরে।’

যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে পাইলটদের কী করতে হয়, সে বিষয়ে তাঁদের পূর্ণ প্রশিক্ষণ থাকে। এতে অনুসন্ধান, আটক হওয়া এড়ানো, প্রতিরোধব্যবস্থা, পালিয়ে থাকা-এসব অন্তর্ভুক্ত। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের পর প্যারাস্যুটে ভূমিতে নামার আগেই এই প্রশিক্ষণ সক্রিয় হয়ে ওঠে।

টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিউস্টন বলেন, পাইলটরা তাঁদের করণীয় সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো তথ্য প্যারাস্যুটে ভেসে নামার সময় পান। কোথায় লুকাবেন, কোন জায়গা এড়িয়ে যাবেন—এসবের ধারণা তখনই পাওয়া যায়।

‘চারপাশে তাকিয়ে এ সম্পর্কে ধারণা নিতে হয়। কেননা একবার ভূমিতে নেমে এলে আর বেশি দূর পর্যন্ত দেখা যাবে না’—বলছিলেন হিউস্টন। তাঁর ঝুলিতে প্রায় ৪০০ ঘণ্টা যুদ্ধবিমান চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইরাক-আফগানিস্তানে অভিযানে অংশ নিয়েছেন। জটিল পরিস্থিতিতে প্যারাস্যুট নিয়ে অবতরণের দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

ভূমিতে নামার মুহূর্তটা অত্যন্ত জটিল। এ সময় আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, বলেন হিউস্টন। তিনি আরও বলেন, প্যারাস্যুটে নেমেও পায়ের পাতা, গোড়ালি বা পুরো পায়ে আঘাত পাওয়া সম্ভব।

সাবেক এই পাইলট বলেন, ভিয়েতনাম থেকে বেঁচে ফেরা অনেকের এমন আঘাতের প্রচুর ঘটনা রয়েছে। ওই সময় অনেকে যুদ্ধবিমান থেকে বেরোনোর সময় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। হাড় ভেঙেছেন।

প্যারাস্যুটে নেমে আসার পরপর পাইলটকে নিজের অবস্থা খতিয়ে দেখতে হয়। শারীরিক অবস্থা কেমন, চলাফেরা করতে পারবেন কি না—বোঝার চেষ্টা করতে হয়, বলেন হিউস্টন।

হিউস্টনের মতে, পাইলটরা পরবর্তী করণীয় নিয়ে মূল্যায়ন শুরু করেন। কোথায় আছেন? শত্রুপক্ষের এলাকায় নাকি নিরাপদ জায়গায়? কোথায় লুকাবেন? কীভাবে যোগাযোগ করবেন? এসব নিয়ে ভাবেন।

হিউস্টন বলেন, ‘যতটা সম্ভব শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়া এড়ানোর চেষ্টা করতে হয়। আর আমি যদি কোনো মরুভূমিতে অবতরণ করি, তাহলে আগে পানি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করব।’

সাবেক পাইলটের ভাষ্য, ‘ভূমিতে আমার প্রথম অগ্রাধিকার হবে আত্মগোপন করা। কারণ, আমি ধরা পড়তে চাই না। আমি এমন একটি জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে চাই, যেখান থেকে আমাকে উদ্ধার করা যাবে।’

‘শহরে সেটা হতে পারে কোনো উঁচু ভবনের ছাদ। গ্রামে কোনো বিস্তৃত মাঠ। যেখানে সহজে হেলিকপ্টার নামতে পারবে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে উদ্ধারকাজ করতে পারবে’—বলেন হিউস্টন।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন পাইলটদের কাছে একটি ছোট বাক্স থাকে। তাতে রেডিও এবং যোগাযোগের যন্ত্রাংশ রয়েছে। হিউস্টন আরও বলেন, তিনি যখন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান থেকে জরুরিভাবে বেরতেন, তখন সঙ্গে একটি পিস্তল রাখতেন।