রংপুরের কাচারি বাজার এলাকায় সকাল হতেই জমজমাট ভিড় হয়। অফিস-আদালতপাড়া নামে পরিচিত এখানে এক তরুণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মাথায় ক্যাপ, লাল ব্যাগ কাঁধে, মুখে হাসি নিয়ে তিনি ঘুরে ঘুরে কফি বিক্রি করছেন।
তরুণটি মোহাম্মদ আরিফ হোসেন। তাঁকে সাধারণ কফি বিক্রেতা ভাবা যাবে না, কারণ তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। চাকরির পথ এড়িয়ে তিনি নিজের পছন্দমতো ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন।
আরিফের জন্মগ্রহণ গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায়। তাঁর বাবা অটোচালক। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। সুন্দরগঞ্জ আবদুল মজিদ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ডি ডব্লিউ কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
৩১ মার্চ রংপুর জিলা স্কুল মাঠে আরিফ হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি ২০১৮ সালে একটি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের গাইবান্ধা কার্যালয়ে হিসাব ও প্রশাসন বিভাগে কাজ শুরু করেন। পরে ২০২৩ সালে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং অফিসার হিসেবে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে যোগ দেন। ২০২৪ সালে রংপুরে ফিরে একটি গ্রাফিকস প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন।
সেই সময় আরিফ স্ত্রী রুমান আখতার ও আড়াই বছরের ছেলে আবদুর রহমানকে নিয়ে জুম্মাপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তাঁর স্ত্রী অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।
বেসরকারি চাকরিতে আরিফের মাসিক বেতন ছিল ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। এই আয়ে সংসার চালাতে তাঁকে কষ্ট হতো। আরিফ বলেন, ‘মাস শেষে কোনো সঞ্চয় থাকত না। দিন আনা দিন খাওয়ার মতো অবস্থা ছিল।’
বিকল্প আয়ের উপায় খুঁজতে আরিফ কিছুদিন ফুডপান্ডায় খণ্ডকালীন কাজ করেন, কিন্তু সুবিধা হয়নি। একদিন ইউটিউবে চট্টগ্রামের এক ব্যক্তির কফি বিক্রির ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হন। পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ৫ হাজার ২০০ টাকায় সরঞ্জাম কিনে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কফি বিক্রি শুরু করেন।
প্রথমে চাকরির সঙ্গে বিকেলে কফি বিক্রি করতেন। তিন মাসের মধ্যে ভালো সাড়া পেয়ে কাচারি বাজার, জেলা স্কুল মোড়, পৌর বাজার ও সুপার মার্কেট এলাকায় নিয়মিত বিক্রি শুরু করেন। সরকারি অফিসপাড়ার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তাঁর কফি জনপ্রিয় হয়।
গ্রাহকের চাহিদা ও আয়ের সম্ভাবনা দেখে ২০২৫ সালের মে মাসে চাকরি ছেড়ে দেন আরিফ। এখন প্রতিদিন সাড়ে ৬ কেজি সরঞ্জাম কাঁধে নিয়ে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা ও বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কফি বিক্রি করেন।
আরিফ জানান, দৈনিক বিক্রি ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা। মাসে বিক্রি হয় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে মাসে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাভ হয়।
স্নাতকোত্তর পাস করে কফি বিক্রির প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আরিফ বলেন, ‘আমি কাজটা উপভোগ করি। চাকরিতে অনেক বাধ্যবাধকতা থাকে, এখানে আমি স্বাধীন।’ শুরুতে নেতিবাচক কথা শুনলেও এখন অনেকে প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘এখন আয় শুনে সবাই ভালোই বলে। প্রয়োজনে ডাকে, অনুষ্ঠানে যেতে পারি—চাকরির সময় সেটা পারতাম না।’
রংপুর আদালতের আইনজীবী ও ব্লাস্টের রংপুর ইউনিটের সমন্বয়কারী দিলরুবা রহমান আরিফকে বেকার যুবকদের জন্য অনুকরণীয় মনে করেন। তিনি বলেন, ‘শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে বা হতাশ হয়ে বেকার না থেকে ছোট কিছু দিয়ে হলেও শুরু করা যায়—এ ক্ষেত্রে আরিফ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে।’
আরিফ জানান, শুরু থেকেই স্ত্রী তাঁকে সমর্থন দিচ্ছেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তিনি বলেন, ‘একদিন নিজের একটা রেস্টুরেন্ট বা কফি শপ দিতে চাই।’ তাঁর মতে, মানুষ শুধু সাফল্য দেখে, পেছনের কষ্ট দেখে না। সৎ পথে যে কোনো কাজই সম্মানের।






