চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৮০ জন রোগী। গতকাল বৃহস্পতিবার দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। চার দিনে ১২৩ জনের নমুনা পাঠানো হয়েছে পরীক্ষার জন্য।
চট্টগ্রামে হামের উপসর্গগ্রস্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। মার্চের শেষে জেলার হাসপাতালগুলোতে সন্দেহজনক রোগী ছিল ৫৫ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার সংখ্যা উন্নীত হয়ে ৮০ জনে পৌঁছে। দুই দিনে এ বৃদ্ধি প্রায় ৪৫ শতাংশ। একই দিনে দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরিস্থিতি বিবেচনায় হাসপাতালগুলোতে আলাদা কর্নার চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, রোগী বাড়ায় সব সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। সংক্রমণ রোধে সন্দেহভাজন রোগীদের আলাদা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রম জোরদার ও অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চার দিনে ১২৩ জনের নমুনা পাঠানো হয়েছে পরীক্ষার জন্য। এখন পর্যন্ত আটজনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
কিন্তু জেলার ১০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে চারটিতে এখনো হামের আলাদা কর্নার চালু হয়নি। এই চার উপজেলা হলো কর্ণফুলী, সন্দ্বীপ, হাটহাজারী ও রাউজান। অথচ এসব উপজেলায় হামের উপসর্গ থাকা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। অন্য ছয় উপজেলায় দুই থেকে পাঁচ শয্যার আইসোলেশন কর্নার রয়েছে। এসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩০ থেকে ৫০ শয্যার।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উপজেলায় হামের তুলনায় সাধারণ রোগীর চাপ বেশি। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি না রেখে বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে। গুরুতর হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশি-হাঁচির মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়ায়। হাম ও হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া শিশুদের অবশ্যই আলাদা রাখতে হয়। অন্য শিশুদের সঙ্গে রাখা হলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, চট্টগ্রাম নগরের তিন হাসপাতালে গত শনিবার থেকে গতকাল পর্যন্ত ৮০ জন হাম ও হামের লক্ষণ থাকা রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ রোগী চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কর্ণফুলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্থায়ী ভবন না থাকায় সেখানে হামের আলাদা কর্নার করা সম্ভব হয়নি। গতকাল পর্যন্ত সেখানে হামের সন্দেহে একজন রোগী পাওয়া গেছে। তাকে নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে।
সন্দ্বীপ উপজেলায় পাঁচ শিশুর হাম সন্দেহে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। রাউজানে আটজনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। হাটহাজারীতে ছয়জন সন্দেহজনক হামের রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। এর মধ্যে দুজনের নমুনা ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল) পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। কেউ ভর্তি নেই, তাই এই তিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলাদা হাম কর্নারও নেই।
কর্ণফুলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগের কার্যক্রম চলছে বড় উঠান ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনে। ফলে সেখানে আলাদা আইসোলেশনের আপাতত সুযোগ নেই। সন্দ্বীপ, রাউজান ও হাটহাজারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের চাপ দেখা যায়নি। তবে জ্বর, সর্দি, কাশি নিয়ে আসা শিশুদের দেখা গেছে।
রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাজাহান বলেন, “বর্তমানে অন্যান্য রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। আলাদা কর্নার করে শয্যা খালি রাখলে অন্য রোগীরা শয্যা পাচ্ছে না। সংক্রমণ যাতে ছড়িয়ে না যায় সে কারণে আমরা বাড়িতে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। সেখানে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।” একই কথা বলেন সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মানস কুমার বিশ্বাস।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমরা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালগুলোতে নির্দেশনা দিয়েছি। হামের লক্ষণ নিয়ে আসা রোগী না থাকায় হয়তো তারা আলাদা কর্নার করেনি। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তাদের জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হবে।”
সরকারি তদারকি আরও জোরদার করা উচিত বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কেন্দ্রের সদস্যসচিব ডা. সুশান্ত বড়ুয়া। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সরকার স্পষ্ট ঘোষণা দিচ্ছে আইসোলেশন কর্নার করার। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সেটি যথাযথ মানা হচ্ছে না। এটি অবশ্যই দায়িত্বশীলদের গাফিলতি। হামের রোগীদের অন্য রোগীদের সঙ্গে রাখলে দ্বিগুণ হারে সংক্রমণ ছড়াবে।
এদিকে জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ডেঙ্গু কর্নারটিকে হাম কর্নার করা হয়েছে। সেখানে শয্যাসংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ সেবাসহ কোভিড ব্লকটিকে এখন হাম কর্নার করা হয়েছে। সেখানে শয্যাসংখ্যা এখন পর্যন্ত আটটি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) ছয় শয্যার আলাদা ব্যবস্থা আছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রতিনিধিরা]






