বাংলাদেশের অটোমোবাইল বাজারে এখন পরিবর্তনের দিন চলছে। গতি, আভিজাত্য এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির খোঁজে ক্রেতারা আধুনিক এসইউভির দিকে ঝুঁকছেন। এই চাহিদা পূরণে বিশ্বখ্যাত ‘চেরি’ ব্র্যান্ড দেশে নিয়ে এসেছে এশিয়ান মটরসপেক্স লিমিটেড। বাজারের চ্যালেঞ্জ, চেরির সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মুক্তকণ্ঠর সঙ্গে কথা বলেছেন কোম্পানির বিক্রয় বিভাগের প্রধান আবু নাসের মাহমুদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুল হক মো. মিরাজ। সম্প্রতি এই সাক্ষাৎকার মুক্তকণ্ঠর অটোমোবাইল সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

দেশে এখন অনেক বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড রয়েছে। এর মধ্যে এশিয়ান মটরসপেক্স কেন শুধু ‘চেরি’ বেছে নিয়েছে? অন্য চীনা ব্র্যান্ডের তুলনায় চেরির আলাদা দিক কী?

আবু নাসের মাহমুদ: ‘চেরি’ বেছে নেওয়ার প্রধান কারণ এর প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা। চেরি বর্তমানে বিশ্বের ৮০টির বেশি দেশে সফলভাবে ব্যবসা চালাচ্ছে এবং চীনের শীর্ষস্থানীয় গাড়ি রপ্তানিকারক ব্র্যান্ডগুলোর একটি। চেরির বিশেষত্ব তাদের নিজস্ব ইঞ্জিন ও প্রযুক্তি উন্নয়ন ক্ষমতা। আমরা চেরিকে বাংলাদেশে ‘ভ্যালু-ফর-মানি’ প্রিমিয়াম লাক্সারি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, যেখানে সাশ্রয়ী দামে ক্রেতারা আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত নিরাপত্তা এবং আভিজাত্য উপভোগ করবেন।

প্রতিযোগিতাময় বাজারে চেরির ‘টিগো’ সিরিজের মডেলগুলো ক্রেতাদের কাছে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে?

আবু নাসের মাহমুদ: ‘টিগো’ সিরিজ নিয়ে আমরা অবিশ্বাস্য সাড়া পেয়েছি। বিশেষ করে টিগো ৯, টিগো ৮ প্রো এবং টিগো ক্রস মডেলগুলো এখন ক্রেতাদের প্রিয়। টিগো ৯ প্লাগ-ইন হাইব্রিড সিরিজ আমাদের বড় শক্তি; এটি এক ট্যাঙ্ক তেল এবং এক ফুল চার্জে ১,৩৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে। অন্যদিকে, টিগো ৮ প্রো একটি বিলাসবহুল ৭ সিটের এসইউভি, যার ১ দশমিক ৬ লিটার টার্বো ইঞ্জিন এবং প্রিমিয়াম বাহ্যিক ডিজাইন পরিবার ও করপোরেট জীবনধারার জন্য আদর্শ।

সরকার এখন স্থানীয় গাড়ি সংযোজনের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এশিয়ান মটরসপেক্স কি বাংলাদেশে চেরির নিজস্ব কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে?

আবু নাসের মাহমুদ: আমরা সরকারের উৎপাদনবান্ধব নীতিকে খুব ইতিবাচকভাবে দেখছি। এশিয়ান মটরসপেক্স ইতিমধ্যে চেরির গ্লোবাল টিমের সঙ্গে বাংলাদেশে লোকাল অ্যাসেম্বলি বা স্থানীয় সংযোজন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। বাজারের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা এবং নীতিগত সহায়তা বিবেচনায় ধাপে ধাপে স্থানীয় সংযোজন শুরু করার পরিকল্পনা করছি।

ডলারের দাম বাড়া এবং উচ্চ শুল্কের এই সময়ে সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতায় দাম রাখতে আপনাদের কী কৌশল?

আবু নাসের মাহমুদ: বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং। তবে অপারেশনাল দক্ষতা বাড়িয়ে এবং চেরির বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইনের সুবিধা কাজে লাগিয়ে দাম সহনীয় রাখার চেষ্টা করছি। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের ফাইন্যান্স পার্টনারশিপ, বিশেষ অফার এবং কাস্টমাইজড প্যাকেজ দিয়ে গাড়ি কেনা সহজ করছি।

চীনা গাড়ি নিয়ে ক্রেতাদের প্রায়ই পুনর্বিক্রয় মূল্য এবং যন্ত্রাংশের উপলব্ধতা নিয়ে সন্দেহ হয়। এর মোকাবিলায় আপনাদের পদক্ষেপ কী?

আবু নাসের মাহমুদ: এই সন্দেহ দূর করতে আমরা গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। এশিয়ান মটরসপেক্স পর্যাপ্ত অরিজিনাল যন্ত্রাংশের স্টক এবং আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান নিশ্চিত করছে। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম ও খুলনায় সার্ভিস সেন্টার রয়েছে এবং প্রতি জেলায় সেন্টার গড়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি। চেরির উচ্চ গুণগত মানের কারণে ক্রেতারা ভালো রিসেল ভ্যালু পাচ্ছেন। এছাড়া নিয়মিত সার্ভিসিং, ওয়ারেন্টি সাপোর্ট এবং ‘বাই ব্যাক’ অফার দিচ্ছি, যা ক্রেতাদের আস্থা বাড়াচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী ইভি ও হাইব্রিড গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বাংলাদেশে চেরির পরিবেশবান্ধব এসব গাড়ি কবে আসবে?

আবু নাসের মাহমুদ: চেরি ইভি ও হাইব্রিড সেগমেন্টে বিশ্ববাজারে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের চার্জিং অবকাঠামো ও নীতিগত সুবিধা বিবেচনায় শিগগিরই এসব মডেল আনব। আগামী পাঁচ বছরে ইভি, হাইব্রিডসহ নতুন পাঁচ থেকে সাতটি মডেল বাজারে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

ওয়ারেন্টি এবং কাস্টমার কেয়ারে আপনাদের কী উদ্ভাবনী সেবা?

আবু নাসের মাহমুদ: আমরা প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় জোর দিচ্ছি। ডিজিটাল সার্ভিস বুকিং, সার্ভিস রিমাইন্ডার এবং এক্সটেন্ডেড ওয়ারেন্টি প্যাকেজ দিয়ে ক্রেতাদের ঝামেলামুক্ত অভিজ্ঞতা দিচ্ছি। এই গ্রাহককেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে আলাদা করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

অটোমোবাইল খাতে নতুন বিনিয়োগকারী বা ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে আপনার পরামর্শ কী?

আবু নাসের মাহমুদ: এই খাত সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর এবং এখানে ধৈর্য দরকার। আমার পরামর্শ—পণ্য ও সেবার মানে কোনো আপস করবেন না এবং বাজার ভালোভাবে বুঝে সিদ্ধান্ত নিন। ক্রেতার আস্থাই এই খাতের সবচেয়ে বড় সম্পদ, যা টেকসই সাফল্য এনে দেয়।