মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে ফিলিং স্টেশনে ডিজেলের জন্য লম্বা লাইন পড়েছে প্রতিদিনের দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটের মধ্যে ঢাকায় মশা নিধনের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা উঠেছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে উড়ন্ত মশা মারতে যন্ত্রের সাহায্যে ওষুধের ধোঁয়া ছড়ানো হয়। বিকেলবেলায় এই কাজ চলে, যাকে বলা হয় ফগিং। এই ফগিংয়ের ওষুধ তৈরিতে ডিজেল লাগে। কিন্তু ঠিকাদাররা ডিজেল পাচ্ছেন না বলে দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সূত্রের মতে, ঢাকা উত্তর সিটিতে ফগিংয়ের জন্য এখন প্রায় সোয়া তিন লাখ লিটার ডিজেল দরকার। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে দুই লাখ লিটার। প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়ার জন্য ঠিকাদারের পাশাপাশি সিটি কর্তৃপক্ষও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করে চলেছেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ফগিংয়ে মেলাথিয়ন ব্যবহার করে। প্রতি লিটার ডিজেলে ৫ শতাংশ মেলাথিয়ন মিশিয়ে চালানো হয়। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ব্যবহার করে ডেলটামেট্রিন। প্রতি লিটার ডিজেলে শূন্য দশমিক ১ মিলিলিটার ডেলটামেট্রিন মেশানো হয়।
ঢাকা উত্তর সিটিতে ৫৪টি ওয়ার্ড রয়েছে। এখানে দৈনিক ফগিংয়ে ১ হাজার ১০০ লিটার মেলাথিয়ন (ডিজেলমিশ্রিত) লাগে। গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত এ সিটিতে প্রায় ২৭ হাজার লিটার মেলাথিয়ন মজুত ছিল, যা দিয়ে অন্তত ২৫ দিন (২৫ এপ্রিল পর্যন্ত) কাজ চালানো যাবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৭৫টি ওয়ার্ড রয়েছে। দৈনিক কত পরিমাণ ডেলটামেট্রিন লাগে বা সর্বশেষ কত লিটার মজুত আছে, সেই তথ্য কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক জানাতে পারেননি। তবে করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাসখানেকের মশা নিধনের ওষুধ তাঁদের হাতে রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীতে মশার উপদ্রব বেড়েছে। নগরবাসীসহ সব মহল থেকে মশা নিধন অভিযান জোরদার করার দাবি উঠেছে। কিন্তু ডিজেল সংকট এর মধ্যে মশার উপদ্রব আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
উত্তরে লাগবে সাড়ে তিন লাখ লাখ লিটার
ওষুধের প্রয়োজন জেনে গত ১২ মার্চ ঢাকা উত্তর সিটির ভান্ডার ও ক্রয় বিভাগ ১৬ কোটি ২৯ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেয় নতুন মেলাথিয়ন কেনার জন্য। এতে ঠিকাদার এম আর এন্টারপ্রাইজকে আগামী ১১ মাসের মধ্যে ৩ লাখ ৬০ হাজার লিটার মেলাথিয়ন সরবরাহ করতে বলা হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী, ঠিকাদারকে ডিজেল মিশিয়ে মেলাথিয়ন দিতে হয়। মজুত ওষুধ ফুরিয়ে আসায় ডিএনসিসির কর্মকর্তারা ঠিকাদারকে দ্রুত সরবরাহ শুরু করার নির্দেশ দিচ্ছেন।
ডিজেল সংকটে ওষুধ সরবরাহ করতে না পারার বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছেন ঠিকাদার হাবিবুর রহমান গাজী। ডিজেল পাওয়ার জন্য সুপারিশ চেয়ে একটি লিখিত আবেদনও করেছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার করা আবেদনে তিনি লিখেছেন, মেলাথিয়ন তৈরিতে ডিজেল পাচ্ছেন না।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ৩ লাখ ৬০ হাজার লিটার মেলাথিয়ন প্রস্তুতের জন্য ৩ লাখ ২৭ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন। এই ডিজেল পাওয়ার জন্য প্রশাসক সরকারি তেল কোম্পানিগুলোর কাছে সুপারিশ করুন।
ডিজেলই পাওয়া যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে চেষ্টা করেও এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
হাবিবুর রহমান, ডিএনসিসির ঠিকাদার
ঠিকাদার হাবিবুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ডিজেল থাকলে কারখানায় প্রতিদিন (এক শিফটে) ১৮ হাজার লিটার মেলাথিয়ন তৈরি সম্ভব। দিন-রাত দুই শিফটে কাজ করলে উৎপাদন দ্বিগুণ হয়। কিন্তু ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। দ্রুত ডিজেল না পেলে সরবরাহ সম্ভব হবে না।
ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ডিজেলের জন্য সিটি করপোরেশন সরকারি তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আশা করা যাচ্ছে, ৭ এপ্রিলের মধ্যে ঠিকাদাররা ডিজেল পাবেন। ফলে কোনো সংকট হবে না।
দক্ষিণে প্রয়োজন দুই লাখ লিটার
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ফগিংয়ে দৈনিক কত ডেলটামেট্রিন লাগে বা কতদিনের ওষুধ মজুত, সেই তথ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে চাওয়া হয়েছিল। গতকাল তাৎক্ষণিক দিতে পারেননি তাঁরা। সংকটের আশঙ্কা থাকলেও দৈনিক চাহিদা ও মজুতের হিসাব করা হয়নি বলে জানা গেছে।
গত ১১ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন। চিঠিতে মশার ওষুধ ডেলটামেট্রিন প্রক্রিয়াকরণে দুই লাখ লিটার ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ৬ লাখ ২১ হাজার ৫২০ লিটার ডেলটামেট্রিন সরবরাহে ঠিকাদার ফরোওয়ার্ড ইন্টারনেশনাল (বিডি) লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে দুই লাখ লিটার দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু ঠিকাদার জানিয়েছে, ওষুধ তৈরিতে ডিজেল পাচ্ছে না।
হাতে দু-আড়াই মাসের ওষুধ মজুত রয়েছে। এর মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে মশা নিধনের কাজে কোনো সমস্যা হবে না।
জহিরুল ইসলাম, সিইও, ডিএসসিসি
চিঠিতে গত বছরের তুলনায় মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়া উল্লেখ করে ডিজেল না পেলে মশা নিধন বন্ধ হয়ে জনদুর্ভোগ বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
ডিজেল সংকটের সমাধান হয়েছে কিনা জানতে চাইলে জহিরুল ইসলাম গতকাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সমস্যার সমাধান ঠিকাদারের মাধ্যমে করা হচ্ছে।
ডিএসসিসির হাতে দু-আড়াই মাসের ওষুধ আছে জানিয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন, এর মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে মশা নিধনের কাজে কোনো সমস্যা হবে না।






