সুন্দরবনের ভেতরে হরিণ ধরতে চোরা শিকারিদের পাতা ফাঁদ বাঘের জন্য নতুন বিপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ৪ জানুয়ারি হরিণের ফাঁদে আটকে পড়া আহত একটি বাঘ উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। এর আগে ২০১২ সালে এ রকম ফাঁদে আটকে পা হারিয়েছিল একটি বাঘ। ২০১৪ সালে ফাঁদ ছিঁড়ে বের হয়ে আসা আরেকটি বাঘ পরে মারা গিয়েছিল।

বন্য প্রাণিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরিণ শিকারে বাঘের বিপদ বাড়ছে দুই দিক থেকে। প্রথমত, এতে বাঘের জন্য প্রয়োজনীয় শিকারের প্রাপ্যতা কমছে। অর্থাৎ যত হরিণ থাকা দরকার, তা কমছে। অন্যদিকে এসব ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘের অঙ্গহানিসহ মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।

২০২৪ সালে বন বিভাগের করা সর্বশেষ জরিপে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা ছিল ১২৫।

বাঘ সংরক্ষণে সরকারের নেওয়া ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনা ‘টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৮-২০২৭)’-এ বলা হয়েছে, একটি এলাকায় বাঘের সংখ্যা কেমন হবে, সেটি নির্ভর করে ওই এলাকায় হরিণের প্রাপ্যতা কেমন তার ওপর। স্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায় হরিণ শিকার করতে একটি বাঘের বিপরীতে কমপক্ষে ৫০০ হরিণ থাকতে হয়। সুন্দরবনে বাঘের মূল খাবার চিত্রা হরিণ। এ ছাড়া আছে বন্য শূকর ও মায়া হরিণ।

বন বিভাগ বলছে, হরিণ শিকারে চার ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করছে চোরা শিকারিরা—মালা ফাঁদ, ছিটকা ফাঁদ, হাঁটা ফাঁদ ও গলা ফাঁদ। সবচেয়ে বেশি পাতা হচ্ছে মালা ফাঁদ। নাইলনের রশি দিয়ে বনের ভেতরে এসব ফাঁদ পাতা হচ্ছে। ৪ জানুয়ারি উদ্ধার করা বাঘটি আটকা পড়েছিল ছিটকা ফাঁদে।

ছিটকা ফাঁদ হচ্ছে বৃত্তাকারে পাতা ফাঁদ; এগুলো বসানো হয় একটি একটি করে। মালা ফাঁদ হচ্ছে এক গাছ থেকে রশি টেনে নিয়ে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে অন্য একটি গাছের সঙ্গে বাঁধা হয়। এরপর ওই রশিতে পাশাপাশি মালার মতো অনেকগুলো ফাঁদ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। রশি দিয়ে বানানো গলা ও হাঁটা ফাঁদ হলো ভূমি থেকে অল্প উঁচুতে পাতা ফাঁদ। গলা ফাঁদে হরিণের গলা আটকে যায় আর হাঁটা ফাঁদে আটকায় পা।

বন বিভাগের তথ্য বলছে, সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের অধীন থাকা শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ থেকে গত আট মাসে (গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর) ৬১ হাজার ১০ ফুট মালা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। ছিটকা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে ৩৮০টি, হাঁটা ফাঁদ ২ হাজারটি ও গলা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে ২০ ফুট।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগ জানিয়েছে, গত দুই বছরে তারা উদ্ধার করেছে ১ হাজার ২০০ ফুট মালা ফাঁদ এবং ১ হাজার ২০০ ফুট গলা ফাঁদ। হাঁটা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে ৭৪৮টি।

সুন্দরবনের এ দুই বিভাগে গত দুই বছরে শিকারিদের কাছ থেকে ১ হাজার ১৪৮ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়েছে।

ফাঁদ ও মাংস উদ্ধারের এসব ঘটনায় ৬৯ জনকে আসামি করে ২২টি মামলা করেছে পূর্ব বন বিভাগ। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬২ জনকে। অন্যদিকে পশ্চিম বন বিভাগ মামলা করেছে ৫০টি। আসামি করা হয়েছে ১৩০ জনকে। তাঁদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৯ জন।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগে সবচেয়ে বেশি ফাঁদ পাতা হয় খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢানমারি, জংরা, মরা পশুর, কোকিলমনি ও কচিখালি এলাকায়। কচিখালি ও কোকিলমনিতে পাথরঘাটা থেকে আসা লোকজন বলেশ্বর নদী পার হয়ে বনে ঢুকে এসব ফাঁদ পাতে।

সুন্দরবনের পশ্চিম বিভাগের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি ফাঁদ পাতা হয় কাশিয়াদি এলাকায়। এরপর কালাবাগী, বানিয়াখালী, নীলকমলে ফাঁদ পাতার হার বেশি।

কারা এসব ফাঁদ পাতে, জানতে চাইলে বন বিভাগের খুলনা সার্কেলের সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সুন্দরবন এলাকার অনেকের পেশাই হলো হরিণের মাংস বিক্রি করা। বিশেষ করে বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার বিশ্বাসপাড়া, দরদুয়ানি, গ্যাংপাড়া, শরণখোলা এলাকার অনেক মানুষ সুন্দরবনে যুগ যুগ ধরে হরিণ শিকার করে থাকে।

রেজাউল করিম বলেন, টহল বাড়ানো হয়েছে, তাই ফাঁদ উদ্ধারও হচ্ছে আগের চেয়ে বেশি। অনেক সময় ফাঁদে আটকা পড়া হরিণ উদ্ধার করে অবমুক্ত করা হয়। তিনি জানান, তাঁদের দুটি স্মার্ট প্যাট্রল টিম আছে। মাসে দুটি টহল হয়। একবার টহলে গেলে টানা দুই সপ্তাহ থাকতে হয়।

ফাঁদ পাতার সময় হাতেনাতে চোরা শিকারিদের ধরার সংখ্যা পূর্ব বন বিভাগে বেশি।

খাদ্যশৃঙ্খলে বাঘের জন্য হরিণ খুব গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড হাসিনুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, হরিণ রক্ষায় তাঁরা ফাঁদ উদ্ধারে জোরদার তৎপরতা চালাচ্ছেন। তাঁদেরও দুটি স্মার্ট প্যাট্রল টিম রয়েছে।

এ দুই বিভাগীয় বন কর্মকর্তাই বাঘের বিপদ কমিয়ে আনতে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া, নৌযানের সংখ্যা বাড়ানো, টহল বাড়ানো ও স্থানীয়ভাবে সচেতনতা তৈরির ওপর জোর দেন।

হরিণের জন্য পাতা ফাঁদকে বাঘের জন্য অন্যতম হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে সরকারের কর্মপরিকল্পনা টাইগার অ্যাকশন প্ল্যানে। এতে বলা হয়েছে, অনেক বনজীবী আয়ের দ্বিতীয় উৎস হিসেবে বনজ সম্পদ সংগ্রহের পাশাপাশি হরিণ শিকারে ফাঁদ পাতেন। স্থানীয় বাজারে হরিণের মাংসের চাহিদা থাকায় হরিণ শিকার বাড়ছে।

জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘবিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘হরিণের জন্য পাতা এসব ফাঁদ বাঘের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ৪ জানুয়ারি যে বাঘটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটা বনজীবীদের চোখে পড়ায় আমরা জানতে পেরেছি। না হলে জানতে পারতাম না।’

২০২৩ সালে তাঁদের একটি গবেষণায় হরিণের পর্যাপ্ত সংখ্যা পেয়েছিলেন উল্লেখ করে এম এ আজিজ বলেন, প্রতি সপ্তাহে বাঘের জন্য ৫০ বা ৬০ কেজি ওজনের একটি হরিণ প্রয়োজন হয়; কিন্তু এখন যে হারে হরিণ শিকারে ফাঁদ পাতা হচ্ছে, তাতে একটা উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।