বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ হাভিয়ের কাবরেরার চুক্তি নবায়ন হবে, নাকি তাঁকে বিদায় দেওয়া হবে? এই প্রশ্ন নিয়ে আগামীকাল বাফুফের জাতীয় দল কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভা বসছে। ২০২২ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে ৪ বছর ৩ মাস ধরে ডাগআউটে থাকা ৪১ বছরের স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরার চুক্তির সময়কাল শেষ হয়েছে গত ৩১ মার্চ সিঙ্গাপুরের সঙ্গে শেষ ম্যাচ খেলে। ফুটবলপাড়ায় এখন চলছে আলোচনা, নতুন চুক্তি না নতুন কোচ?

আগামীকালের জাতীয় দল কমিটির সভার আলোচ্যসূচিতে কোচের বিষয় সরাসরি উল্লেখ নেই। সূচিতে রয়েছে জাতীয় দলের সর্বশেষ দুটি ম্যাচ—ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে—নিয়ে আলোচনা। তবে বিবিধ বিষয়ে কোচের ব্যাপারটি উঠে আসতে পারে। যদিও মনে হচ্ছে, কাবরেরাকে এখনই বিদায় দেওয়ার সম্ভাবনা কম। ১-৯ জুন ফিফা উইন্ডোতে বিদেশের মাটিতে প্রীতি ম্যাচ খেলতে পারে বাংলাদেশ। এত অল্প সময়ে কোচ পরিবর্তনের পথে বাফুফে এগোতে পারে না।

কাবরেরা নিজেও চুক্তি চালিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সিঙ্গাপুর ম্যাচে হারের পর তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস, খুব শিগগির আমরা এ ধরনের ম্যাচগুলো জিততে শুরু করব। আমরা যদি এই জায়গাটুকুতে উন্নতি করতে পারি, তাহলে সম্ভবত আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ২০-৩০ ধাপ এগিয়ে থাকতে দেখা যাবে।” এটি তাঁর চুক্তি বাড়ানোর কৌশল বলে মনে হতে পারে। কারণ গত ৪ বছর ৩ মাসে বাংলাদেশের র‍্যাঙ্কিং বেড়েছে মাত্র ৫-৬ ধাপ। কাবরেরা দায়িত্ব নেওয়ার সময় ছিল ১৮৬, এখন ১৮১। মাঝখানে ছিল ১৮০।

তৃতীয় দফায় চুক্তি নবায়নের পর ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ছিল কাবরেরার মেয়াদ। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। আসলে কী তা সভাপতি তাবিথ আউয়াল দেখে জানাবেন বলেছেন। সাধারণ সম্পাদক ফোন ধরেননি। জাতীয় দলের ম্যানেজার আমের খান বলেন, “কাবরেরা আমাকে বলেছেন, তাঁর মেয়াদ ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত।” পুরো বিষয়টি তাবিথ আউয়াল জাতীয় দল কমিটির ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। গতকাল তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “জাতীয় দল কমিটির সভায় বিষয়টা আলোচনায় আসতে পারে। আমরা সবকিছু পর্যালোচনা করব। সামনে আমাদের ঠিক কী কী খেলা আছে, এখনো পরিষ্কার নই। সাফ কবে, তা–ও জানি না। আগামীর সূচি দেখে এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেব। খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের মতামত নেব।”

কাবরেরার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়িয়েছেন ইংলিশ কোচ জেমি ডে। ২৯ ম্যাচে ৯ জয়, ৫ ড্র ও ১৫ হার। জয়ের হার ৩১ শতাংশ। কাবরেরা তাঁকে ছাপিয়ে গেছেন। তাঁর অধীনে ৫১ মাসে বাংলাদেশ ৩৯টি ম্যাচ খেলেছে, যা দেশের ইতিহাসে কোনো কোচের অধীনে সর্বোচ্চ। তবে জয়ের হার মাত্র ২৫.৪৭ শতাংশ। ৩৯ ম্যাচে জয় ও ড্র ১০টি করে, হার ১৯টি। ১০ জয়ের বেশিরভাগ মালদ্বীপ, ভুটান, কম্বোডিয়া ও সেশেলসের বিপক্ষে। উল্লেখযোগ্য জয়, ২২ বছর পর ভারতকে হারানো।

কাবরেরার বিরুদ্ধে একদল সমর্থক আন্দোলন করেছেন, তাঁর বিদায়ের দাবি তুলেছেন। কোচের কৌশল, দল সাজানো নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। সমর্থকদের বড় অভিযোগ, কাবরেরা সিন্ডিকেটের অংশ। পছন্দের খেলোয়াড় দলে রাখেন, তাঁদের কাউকে কাউকে দিয়ে বাফুফের কাছে তদবির করান টিকে থাকার জন্য।

কাবরেরার অধীনে ২০২৩ সালের বেঙ্গালুরুতে ১৪ বছর পর সাফের সেমিফাইনালে ওঠা তাঁর বড় সাফল্য। এছাড়া হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, জায়ান আহমেদদের মতো প্রবাসী ফুটবলারদের নিয়ে দল গঠনে মাঠে দর্শক ফিরেছেন, ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা বেড়েছে। মাঠের খেলাও ভালো হয়েছে। ভারতের বিপক্ষে অ্যাওয়ে ড্র ও দেশে জয় প্রশংসিত। হংকং-সিঙ্গাপুরের সঙ্গে লড়াই আলোচিত।

কিন্তু হামজাদের নিয়ে ৪৫ বছর পর এশিয়ান কাপে খেলার স্বপ্ন ফুটে গেছে। ৬ ম্যাচে ১ জয় ও ২ ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে চার দলের টেবিলে তৃতীয় হয়েছে বাংলাদেশ। জাতীয় দল কমিটির এক সদস্য বলেন, “হামজা-শমিতদের নিয়ে দলের শক্তি অনেক বেড়েছে। কিন্তু ফলাফলে তার প্রতিফলন কোথায়? দল ভালো খেলেছে এই আত্মতৃপ্তিতে চিড়ে ভিজবে না। কোচ বিদায় করা উচিত। একটা মানুষকে কত দিন রাখবেন আপনি?”

কমিটির আরেক সদস্য বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অন্ধকারে আছেন। কাবরেরার ব্যাপারে ভালো-মন্দ সব বলবেন। তিনি বলেন, “আমাদের উচিত ছিল, নতুন কোচ খোঁজা। কিন্তু কোচ খোঁজ হচ্ছে কি না, জানি না। ফর্টিস গ্রুপের অফিসে সর্বশেষ জাতীয় দল কমিটির সভায় সভাপতি নতুন কোচ খুঁজতে বলেছিলেন। এরপর আর কিছু জানি না। অন্ধকারে আছি।” বাফুফের টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান কামরুল ইসলাম হিলটন বলেন, “আমরা অফিশিয়ালি কোনো কোচের বায়োডাটা চাইনি। কোনো বায়োডাটা জমা পড়েছে বলেও আমার জানা নেই।”

হাভিয়ের কাবরেরাকে রেখে দেওয়ার পক্ষে আমি। কারণ, গত চার বছর তিন মাস বাংলাদেশ দলের সঙ্গে কাজ করে তাঁর যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হয়েছে। এত দিন ধরে যে খেলোয়াড়গুলোকে পরিচর্যা করেছেন, তাঁদের সবাইকে তিনি ভালোভাবে চেনেন। এই জন্যই এই কোচটাকে রেখে দেওয়া উচিত। সবকিছু বিবেচনা করে আমি কাবরেরাকে ১০-এর মধ্যে ৯ নম্বর দেব। সামনে জাতীয় দলের ভালো ফলের জন্য কাবরেরার চেয়ে এ মুহূর্তে ভালো সার্ভিস অন্য কেউ দিতে পারবেন না। কাবরেরার ইতিবাচক দিক হলো, তিনি বাংলাদেশের ফুটবলটাকে খুব কাছ থেকে এত বছর দেখছেন। আমাদের প্রতিটি খেলোয়াড়ের নাড়িনক্ষত্র ভালো করে চেনেন তিনি। তাঁর জায়গায় নতুন কাউকে দিলে সেই কোচের খেলোয়াড় চিনতে চিনতেই অনেক সময় লেগে যাবে। এ সময় আমাদের ফল খারাপও হতে পারে। এ কারণেই ভালো ফলের জন্য কাবরেরাকে আরেকটা সুযোগ দেওয়া যায়। কাবরেরার সময়ে আমাদের দলের মধ্যে একটা লড়াকু মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এটা দেশের ফুটবলের জন্য বিরাট পাওয়া। সবচেয়ে ভালো লেগেছে তাঁর ডিফেন্সিভ অর্গানাইজেশন। যে কারণে আমরা এশিয়ান কাপের বাছাইয়ে কোনো ম্যাচেই বড় ব্যবধানে হারিনি।
শেখ মোহাম্মদ আসলাম, জাতীয় দলের সাবেক স্ট্রাইকার
জয়–পরাজয়ের সামগ্রিক হিসাব বিবেচনায় হাভিয়ের কাবরেরা অনেকটাই পিছিয়ে আছেন। দীর্ঘ ৪ বছর ৩ মাস সময় পেয়েও জাতীয় দলকে কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য তিনি এনে দিতে পারেননি। হামজা ও শমিত সোমের মতো মানসম্পন্ন খেলোয়াড় যুক্ত হওয়ার পর দলের শক্তি বাড়লেও তার প্রতিফলন ফলাফলে দেখা যায়নি। ধারণা ছিল, অন্তত এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার মতো অবস্থান তৈরি করবে দল, সেটিও অর্জিত হয়নি। এ সময়ে দলের জন্য কার্যকর কোনো স্টাইল গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন কাবরেরা। বর্তমানে দলের শক্তি ও খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত সামর্থ্য বিবেচনায় এমন একজন কোচ প্রয়োজন, যাঁর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সাফল্য রয়েছে। এশিয়ান কাপে বাংলাদেশ দল কিছুটা ভালো পারফরম্যান্স করেছে মূলত খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে। কাবরেরার কোচিং কৌশল, ট্যাকটিকস বা দল নির্বাচন—সবকিছুতেই অনেক সময় লেজেগোবরে অবস্থা হয়েছে। কাবরেরার একাদশ প্রায়ই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। লিগের সময় তিনি দেশের বাইরে থাকেন। এসে বেঞ্চের খেলোয়াড় নেন, পারফর্ম করা খেলোয়াড়দের মনোবল এতে নষ্ট হয়। চার বছরেও দলে একজন স্ট্রাইকার যুক্ত করতে পারেননি। তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। কাবরেরার চুক্তি বাড়ানোর কোনো যুক্তিই দেখছি না।
জাহিদ হাসান এমিলি, জাতীয় দলের সাবেক স্ট্রাইকার