টাইব্রেকারে ইতালির তৃতীয় শট নিতে গুটিগুটি পায়ে এগোচ্ছিলেন ব্রায়ান ক্রিস্তান্তে। চারপাশে গ্যালারিভর্তি উত্তাল সমর্থকের বেশিরভাগই বসনিয়ান। মাথায় তাই পাহাড়সম চাপ। শীর্ষ পর্যায়ে এমন চাপ নিয়ে খেলা স্বাভাবিক হলেও ক্রিস্তান্তে নিশ্চয়ই ভাবেননি, টাইব্রেকারে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতে পারে!
ক্রিস্তান্তে ভেবে রেখেছিলেন, চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালির হয়ে বিশ্বকাপে খেলবেন। কিন্তু মঙ্গলবার রাতের সেই টাইব্রেকারের ফল সবাই জানে। ইউরোপীয় প্লে-অফ ফাইনালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে টাইব্রেকারে ৪–১ গোলে হেরে ইতালির বিশ্বকাপের টিকিট কাটা হয়নি। এতে ইতালিকে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপে দেখা যাবে না! এই নির্মম বাস্তবতা ক্রিস্তান্তের জীবনে রূঢ়ভাবে ধরা দিয়েছে।
সেই রূঢ় বাস্তবতায় যাওয়ার আগে একটা প্রশ্ন—ধরুন, ইতালি বা কানাডার যেকোনো এক দলের হয়ে খেলার সুযোগ আছে। কোনটা বেছে নেবেন?
নিশ্চয়ই ইতালি। সাফল্য ও ঐতিহ্য মিলে এমন সিদ্ধান্ত নিতে কেউ দ্বিতীয়বার ভাববে না। ক্লাব ফুটবলে ইতালিতে বেড়ে ওঠলে ‘আজ্জুরি’ জার্সি তো বেশি টানবে। ক্রিস্তান্তের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। কানাডার হয়ে খেলার সুযোগ থাকলেও তিনি ইতালিকে বেছে নেন।
কেন—সেই প্রশ্ন অবান্তর। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের লড়াই দেখলে কানাডার চেয়ে ইতালির সম্ভাবনা অনেক বেশি, তা বুঝতে ফুটবলবোধ্য হওয়ার দরকার নেই। এবার টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়লেও ২০৩০-এর বাছাইপর্বে হিসাব একই থাকবে। সর্বশেষ তিন বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ফল যাই হোক, ইতালি তো ইতালিই। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের ধারেকাছে কানাডার এখনো অনেক পথ বাকি, যার আগে মাত্র দুবার বিশ্বকাপে খেলেছে।
টাইব্রেকারে ফিরে আসি। ক্রিস্তান্তের মুখ দেখলেই চাপ বোঝা যাচ্ছিল। চাপ সহ্য না করতে পেরে বল মারেন ক্রসবারে। লক্ষ্যভ্রষ্ট শট! ফিরে আসা বলটা পা দিয়ে স্পটে রেখে ফিরছিলেন, সেটা তাঁর জীবনের দীর্ঘতম যাত্রাগুলোর একটা। দর্শকরাও টের পায়, আর সম্ভব নয়। তিন শটের মধ্যে দুটো মিস, শেষটা ক্রিস্তান্তের। বসনিয়া পরের শটে লক্ষ্য ভেদ করে বিশ্বকাপে উঠে যায়, পেছনে ক্রিস্তান্তের আশার সমাধি।
ইতালির সান ভিতো তাগলিয়ামেন্তে জন্ম ক্রিস্তান্তের। কানাডিয়ান বংশোদ্ভূত বাবা ও ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত মা ব্রিটিশ গায়ক ব্রায়ান ফেরির নামে ছেলের নাম রাখেন। বাসা থেকে কাছে সান জিওভান্নি দ্য কাসারসার মাঠে প্রথম লাথি মারেন ফুটবলে। সেখান থেকে ফুটবলারের স্বপ্ন শুরু। অপেশাদার দল লিভেন্তিনা গরগেনসে প্রতিভা ছড়িয়ে পড়ে। মিলানের তৎকালীন যুব টেকনিক্যাল ডিরেক্টর মাউরো বিয়াঙ্কেসি তাঁকে এসি মিলানের বয়সভিত্তিক দলে নেন।
ক্রিস্তান্তের ক্যারিয়ারের বাকি পথ সবাই জানে। ২০০৯ সালে মিলান একাডেমিতে ঢোকার পরের বছর ইতালি অনূর্ধ্ব-১৬ দলে ডাক পান। ধাপে ধাপে অনূর্ধ্ব-২১ পর্যন্ত খেলেন। এএস রোমাতেও জায়গা পাকা হয়। কানাডা না ইতালি—আলোচনা শুরু ২০১৭ সালে। বাবার সুবাদে কানাডিয়ান পাসপোর্ট আছে।
কিন্তু নিজের সামর্থ্যে অটল বিশ্বাস ছিল ক্রিস্তান্তের। কানাডায় জায়গা সহজ হলেও তিনি ধৈর্য ধরে ‘আজ্জুরি’ জার্সি অপেক্ষা করেন। সুযোগ আসে ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে। ড্যানিয়েল ডি রসি, মার্কো ভেরাত্তি ও লরেঞ্জো পেলেগ্রিনি চোটে পড়ায় ২০১৭ সালের অক্টোবরে মেসিডোনিয়া ও আলবেনিয়ার বিপক্ষে প্রথম ডাক পান। ৬ অক্টোবর মেসিডোনিয়ার বিপক্ষে বদলি নেমে অভিষেক হয় এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের।
ক্রিস্তান্তের ইতালি অভিষেকের আগে কানাডার তৎকালীন কোচ অক্টাভিও জামব্রানো ২০১৭ সাল জুড়ে যোগাযোগ করেন। কানাডার হয়ে খেলার চেষ্টা করেন। ইতালি ডাক পাওয়ার পর ক্রিস্তান্তে স্বীকার করেন। কিন্তু আজ্জুরি ফুটবলে মজে থেকে প্রথম ডাকে বলেন, ‘প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করব।’
ইতালি-মেসিডোনিয়া ম্যাচ শুরুর দুই ঘণ্টা আগে ‘স্পোর্টসনেট’কে জামব্রানো বলেন, ‘আমি এখনই এটা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নই। ইতালি তাঁকে ডেকেছে ঠিকই, কিন্তু এটাও বাস্তব যে সেখানে হয়তো তিনি একটি-দুটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েই হারিয়ে যেতে পারেন। আমার মতে, ক্রিস্তান্তে নিজেও বোঝেন যে ইতালির চেয়ে কানাডার দলে তাঁর ভবিষ্যৎ অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী ও নিশ্চিত।’
কিন্তু জামব্রানোর আশা পূরণ হয়নি। ইতালির হয়ে ৪৭ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন ৩১ বছর বয়সী ক্রিস্তান্তে। এবার সেই রূঢ় বাস্তবতায় ফিরি।
ক্রিস্তান্তে কানাডা কোচের ডাকে সাড়া দিলে ২০২২ বিশ্বকাপে খেলতেন। কাতারে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ে কানাডা। আগামী ১১ জুন থেকে শুরু বিশ্বকাপেও স্বাগতিকদের হয়ে খেলার সুযোগ হতো। অর্থাৎ, ক্যারিয়ারে অন্তত দুটি বিশ্বকাপ খেলতেন।
ভাগ্যের মারপ্যাঁচ, কানাডার চেয়ে ইতালির সম্ভাবনা বেশি ভেবে ‘আজ্জুরি’ বেছে নেন। কিন্তু শেষে বিশ্বকাপে খেলাই হবে না হয়তো! পরবর্তী বিশ্বকাপে বয়স হবে ৩৫। ইতালি দলে জায়গা থাকবে কি না, কে জানে! ফুটবলের নির্মমতা—ক্রিস্তান্তে ইতালি-প্রেমের প্রতিদান ট্র্যাজিকভাবে পেয়েছেন। টাইব্রেকারে স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল ক্রসবার!
ক্রিস্তান্তেকে জিজ্ঞাসা করলে—ইতালির জার্সিতে ওই মুহূর্ত উপভোগ করেছেন? উত্তরে আকাশের দিকে তাকাতে পারেন। ভাগ্য না থাকলে কী করা! আরও ট্র্যাজিক, ইতালিকে হারিয়ে ২০২৬-এর ‘বি’ গ্রুপে জায়গা করা বসনিয়া এখন কানাডার বিপক্ষে খেলবে। ১২ জুন টরন্টোয় কানাডার বিপক্ষে ইতালি খেলতে পারত, ক্রিস্তান্তে বাবা-মায়ের দেশের ম্যাচে।
ফুটবল কখনো কখনো খুব নির্মম। খেলোয়াড়ের স্বপ্নকে তার হাতেই ‘খুন’ করে আকাশের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। কেন—এই প্রশ্ন ক্রিস্তান্তে সম্ভবত সারাজীবন করবেন!






