জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘মিথ্যা’ শব্দটি অসংসদীয় বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি জানিয়ে মৃদু বিতর্ক হয়েছে। পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা’ বক্তব্যের অভিযোগ তুলেন। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই শব্দটিকে অসংসদীয় বলে কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ করেন।

আজ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। আসরের নামাজের বিরতির আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, “গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার বক্তব্য নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন যে আমি একটু অসত্য কথা এখানে বলেছি। আমি এটা জানতে পারলাম। আসলে আল্লাহ–তাআলা তাঁকে অপূর্ব দক্ষতা দিয়েছেন; জাস্ট বোতলটা পরিবর্তন করে ম্যাটেরিয়ালসটা ঠিক রেখে তিনি সত্যকে মিথ্যা হিসেবে এবং মিথ্যাকে সত্য হিসেবে চমৎকারভাবে পরিবেশন করতে পারেন। এ জন্য শুধু তাঁকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য আমি এখানে দাঁড়িয়েছি। মাননীয় স্পিকার ধন্যবাদ, অসংখ্য ধন্যবাদ।”

এরপর স্পিকার বলেন, মাননীয় বিরোধী দলের নেতা, আপনি পয়েন্ট অব অর্ডারে নিশ্চয়ই এ বক্তব্য রেখেছেন। পয়েন্ট অব অর্ডার চলমান বিষয়ের ওপরে হয়। এটা তো গতকালের (বুধবার) বিষয়, গতকালই শেষ হয়ে গেছে। সুতরাং এটা এখন আর নতুন করে তোলার কোনো প্রয়োজন নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে স্পিকার বলেন, “মাননীয় মন্ত্রী, এটার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। উনি যদি হাউসে থেকে বলতেন, তাহলে নিশ্চয়ই আপনাকে রাইট অফ রিপ্লাই দিতাম।”

এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাঁড়ালে স্পিকার বলেন, আপনি তারপরও কিছু বলতে চান? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “মাননীয় স্পিকার, এই মুহূর্তে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা দুটি অসংসদীয় শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেটা হচ্ছে “মিথ্যা”। এটা “অসত্য” বললে আমি আপত্তি করতাম না। এই যে আমি কালকে মিথ্যা বলেছি, এই মিথ্যা শব্দটা অসংসদীয় হিসেবে এটি এক্সপাঞ্জ করার জন্য আমি অনুরোধ করছি। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ওনার কালকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলেছিলাম, মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা এখানে একটা অসত্য বক্তব্য উত্থাপন করেছেন। সেটি ছিল যেখানে বিধি ৬২ অনুসারে। আপনি তার পরে একজন বেসরকারি সদস্যের উত্থাপিত মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন, ওনার ওয়াকআউট করার আরও অনেক পরে। তাহলে সেটি পার্লামেন্টে উত্থাপিত বা পঠিত হলো কীভাবে? সুতরাং আমি বলেছি, সে বক্তব্যটা অসত্য।”

এরপর বিরোধীদলীয় নেতা কিছু বলার জন্য আবার দাঁড়ান। স্পিকার বলেন, মাননীয় বিরোধী দলের নেতা এটা নিয়ে আরও বলবেন? বলেন। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “বিভ্রান্তিটা এখানেই মাননীয় স্পিকার। একই বিষয়ে একই প্রস্তাব একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এনেছিলেন। সেই প্রস্তাব ভিন্ন নামে গতকাল এসেছে, শুধু নাম বদল হয়েছে; কিন্তু প্রস্তাব ঠিক আছে। আমি তো আগেরটা জানতাম বলেই বলেছি। এখানে আমি কোনো ভুল তথ্য দিইনি।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘মিথ্যা’ শব্দটি এক্সপাঞ্জ চাইলেও স্পিকার এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। রেওয়াজ অনুযায়ী জাতীয় সংসদে মিথ্যা শব্দটি ব্যবহার করা হয় না। এর পরিবর্তে ‘অসত্য’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। এটিই সংসদের দীর্ঘদিনের চর্চা। এ বিষয়ে অতীতে স্পিকার একাধিকবার রুলিংও দিয়েছেন।

এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা গত ২৯ মার্চ সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক আহ্বানবিষয়ক একটি মুলতবি প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণ করেন স্পিকার। এর পরদিন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার জন্য আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব দিলে স্পিকার এ বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে উল্লেখ করেন। এখনো ওই মুলতবি প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও গতকাল সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়নপদ্ধতি কী হবে, সে বিষয়ে আলোচনার জন্য সংসদে মুলতবি প্রস্তাব দিলে স্পিকার তা গ্রহণ করেন। আগামী রোববার এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হবে।

এদিকে বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবে কোনো সিদ্ধান্ত না আসা এবং তাদের প্রস্তাবটি ‘ধামাচাপা’ দিতে নতুন প্রস্তাব তোলার প্রতিবাদে গতকাল বুধবার সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল বিরোধী দল।