বসন্তের এই সময় সুন্দরবন যেন নতুন করে সাজগোজ করেছে। চারপাশে ফুলের রঙিন ছটা আর মৌমাছির গুঞ্জন। খলিশা, গরান, পশুর ও হরগোজার ফুল ডালে ডালে ফুটে বনাঞ্চলকে রঙধনুর মতো করে তুলেছে। কোথাও সবুজ পাতার মাঝে ছড়িয়ে আছে ছোট সাদা ফুল, কোথাও লালচে-গোলাপি আভায় দুলছে ম্যানগ্রোভের ফুল। হালকা হাওয়ায় ভাসছে ফুলের মধুর গন্ধ, আর সেই গন্ধে মৌমাছির দল উড়ে বেড়াচ্ছে এক ফুল থেকে আরেক ফুলে মধু সংগ্রহ করতে।
বৃহস্পতিবার কয়রার শাকবাড়িয়া নদীপথে সুন্দরবনে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বসন্তের সৌন্দর্য। সবুজের মাঝে প্রকৃতি নতুন করে সাজছে। দূর থেকে খলিশাগাছের ছোট সাদা ফুল মুক্তোর মতো লাগে। গরানগাছের সাদা ফুল শান্ত ও সুন্দর, সহজেই মন ছুঁয়ে যায়। পশুরগাছের ছোট ফুলগুলো সূক্ষ্ম কিন্তু আকর্ষণীয়। চারদিকে বসন্তের নীরব সৌন্দর্য ছড়ানো।
এই ফুলের সমারোহে মৌমাছির গুঞ্জন বনকে জীবন্ত করে তুলেছে। বসন্তের এই সময়টি সুন্দরবনের মধু আহরণের মৌসুমের পূর্বাভাস।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ শুরু হয়েছে, যা চলবে টানা দুই মাস। এ বছর খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১ হাজার ৮০০ কুইন্টাল মধু এবং ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সুন্দরবনে সাধারণত তিন প্রজাতির মৌমাছি—এপিস ডরসাটা, এপিস সেরানা ও এপিস ফ্লোরিয়া দেখা যায়। এর মধ্যে এপিস ডরসাটা থেকেই মূলত বাণিজ্যিকভাবে মধু সংগ্রহ করা হয়। মৌসুমের শুরুতে এই মৌমাছিরা নিচু ডালে চাক বাঁধে। মৌয়ালরা যখন একাধিকবার একটি চাক ভেঙে মধু সংগ্রহ করেন, তখন মৌমাছিরা বিরক্ত হয়ে উঁচু ডালে নতুন করে মৌচাক তৈরি করে—এমনই অভিজ্ঞতা জানান মৌয়ালরা।
বসন্তে সুন্দরবনের প্রতিটি গাছ যেন মধুর উৎস। মৌয়ালদের কাছে খলিশা ফুলের মধু সবচেয়ে প্রথমে আসে। লবণাক্ত মাটিতে জন্মানো এই মাঝারি আকৃতির ম্যানগ্রোভ গাছটি ৫ থেকে ৭ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। এর পাতাগুলো গাঢ় সবুজ আর ছোট ছোট সাদা ফুলগুলো ডালে গুচ্ছাকারে ফুটে অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে। এই ফুলের মধু স্বচ্ছ, ঘন ও মিষ্টি, অনেকটা নারকেল তেলের মতো—ঝাঁজহীন ও কোমল স্বাদের। তবে খলিশাগাছের সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় এই মধু তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়।
এরপর একে একে গরান, কাঁকড়া, পশুর, হরগোজা ও কেওড়া ফুলে আসে মধুর প্রবাহ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুলের ধরন বদলায়, আর সে অনুযায়ী বদলে যায় মধুর স্বাদ ও রং। গরানগাছের ছোট সাদা ফুলগুলো দেখতে খুব সাধারণ হলেও কাছে গেলে এর সৌন্দর্য ও কোমলতা মন ছুঁয়ে যায়। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত গরানে ফুল ফোটে, আর এ ফুলের মধু হালকা লালচে রঙের হয়ে থাকে। অন্যদিকে কাঁকড়াগাছের লালচে বা গোলাপি ফুলগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি চোখে পড়ে। কাঁকড়া ফুল থেকে পাওয়া মধু মিশ্র অবস্থায় অন্য মধুর সঙ্গে মিলে সুন্দরবনের বহু ফুলের মধুকে সমৃদ্ধ করে।
পশুরগাছের ছোট সাদা ফুলগুলো গুচ্ছাকারে ফোটে, সূক্ষ্ম পাপড়ি আর মৃদু সুবাসে ভরপুর। এই ফুলের মধু স্বাদে মিষ্টি হলেও সামান্য কষাভাব থাকে। অন্যদিকে কেওড়াগাছের ফুলের কুঁড়ি দেখতে বেশ অদ্ভুত ও আকর্ষণীয়। গোলাকার এই কুঁড়িগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফেটে গিয়ে সাদা বা হালকা সবুজাভ পাপড়িতে পরিণত হয়, আর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে লালচে কেশরের ঝাঁকড়া রূপ। কেওড়া ফুলের মধু হালকা রঙের, সুগন্ধযুক্ত ও কিছুটা টক-মিষ্টি স্বাদের।
ফুল, মৌমাছি আর মৌয়াল—এই তিনের সমন্বয়ে সুন্দরবন যেন এক অপূর্ব ছন্দে বেঁচে থাকে। বসন্তের এই সময় তাই শুধু ঋতুর পরিবর্তন নয়, এটি এক জীবন্ত চিত্র, যেখানে প্রকৃতি আর মানুষের জীবন একসঙ্গে গাঁথা হয়ে আছে এক অদৃশ্য সুরে।






