‘বাবি গিজারটা দিয়ে এসো, বাবি ব্রাশ নাও। বাবি জল খাও। বাবি এগুলো সব পারে।’ একটা একটা করে শিখেছে সে। আমার ছেলে বাবির কথা বলছি। বাবির বয়স এখন ১৫। ঘরই তার সমগ্র জগৎ। ঘরের বাইরে কেবল স্কুলে যাওয়া-আসা। ঘরে তার রুম, বাথরুম, খাবার টেবিল, কম্পিউটার টেবিল—এগুলোই তার সীমাবদ্ধ বিশ্ব। ঘরের বাইরে খেলার মাঠ নেই, উৎসব নেই, দোকান-বাজার নেই, বন্ধুর বাড়ি নেই। ছোটবেলায় কিছু ছিল, কিন্তু আস্তে আস্তে ঘরবন্দী হয়ে গেছে তার জীবন।

রাশেদ (১৬) স্কুলে যায়। অঙ্কে খুব ভালো করে। কিন্তু কারও সঙ্গে মিশতে চায় না। স্নান করতে অরুচি দেখায়। সেনসরির কারণে গায়ে সাবান মাখতে দেয় না। ঘর থেকে বের হয় না। স্কুলেও কারুর সঙ্গে কথা বলে না। মাঝে মাঝে ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠে। মা অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাবা স্বীকার করতে চায় না। মায়ের চাকরির দোষ দিয়ে ছেলের এ অবস্থা বোঝান। ডাক্তাররা ডায়াগনোসিস করেছেন অটিজম আছে বলে; তবু বাবা এ নিয়ে কথা বলতে চান না।

এ তো দুজন ছেলের কথা। অটিজমে আক্রান্ত মেয়েদের অবস্থা আরও জটিল। বয়ঃসন্ধি এবং নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মা সর্বক্ষণ উদ্বিগ্ন। নিকটাত্মীয়দের বাড়িতেও নিয়ে যেতে ভয় পান তারা।

অটিজমের শিকার অনেক বাচ্চার ছোটবেলায় লক্ষণ বোঝা যায় না। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে কথা না বলা, অস্থিরতা, ভায়োলেন্সের মতো লক্ষণ দেখা দিলে বাবা-মা একা হয়ে পড়েন। যথাযথ থেরাপি, স্পেশাল স্কুল, বিহেভিয়র থেরাপির সচেতনতা বা সাহস থাকে না। সঠিক গাইডেন্সও পান না সচেতনতার অভাবে।

প্রতিবছর ২ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ পালিত হয়। এখনো অটিজম শব্দটির সঙ্গে সামাজিক জড়তা বা নেতিবাচক ধারণা জড়িয়ে আছে।

অটিজম কী এবং কেন? অটিজম বা ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার’ (এএসডি) একটি জটিল স্নায়বিক বিকাশজনিত অবস্থা। এটি সাধারণত শিশুর জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ পায়। এটি সামাজিক যোগাযোগ, আচরণ ও ভাব বিনিময়কে প্রভাবিত করে।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার, যা সংক্ষেপে এডিএইচডি নামে পরিচিত। অটিজম স্নায়ুর বিকাশজনিত ভিন্নতা বা নিউরোডাইভারসিটি হওয়ায় এর কোনো চিকিৎসা নেই। শুধু প্রকাশিত সিম্পটম লাঘবের জন্য থেরাপি দেওয়া হয়। স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত করতে কথা বলা, অস্থিরতা কমানোর বিহেভিয়র থেরাপি করা হয়।

‘স্পেকট্রাম’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অটিজমের বৈশিষ্ট্য প্রত্যেকের একেক রকম। কেউ প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী, কেউ শব্দ-আলোর প্রতি অতি সংবেদনশীল। এই বৈচিত্র্যই এটাকে অনন্য করে। শিশুর উপসর্গ বুঝে থেরাপি দিতে হয়। অনেকের মস্তিষ্কবিকাশের ভিন্নতার সঙ্গে শারীরিক সমস্যাও থাকে।

অটিজম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বংশগত ও পরিবেশগত কারণকে দায়ী করেন। তবে সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক জৈব রাসায়নিক কার্যকলাপ, জিন বা ক্রোমোজোমগত অস্বাভাবিকতা, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠন, বংশগত সমস্যা, গর্ভকালীন জটিলতা, ভাইরাল ইনফেকশন ও বেশি বয়সে সন্তান নেওয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অটিজমে আক্রান্তদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য:

  • ক. চোখের দিকে তাকিয়ে কথা না বলা, একা থাকতে পছন্দ করা।
  • খ. একই কাজ বারবার করা, নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা বা হাত নাড়ানো (Stimming)।
  • গ. উচ্চ শব্দ, কড়া আলো বা নির্দিষ্ট স্পর্শের প্রতি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল থাকা।
  • ঘ. অনেক অটিস্টিক শিশু গণিত, সংগীত, চিত্রাঙ্কন বা কোডিংয়ে অবিশ্বাস্য মেধা দেখায়।

অন্তর্ভুক্তি কেন জরুরি?

বাংলাদেশে প্রতি ৫৮৯ শিশুর মধ্যে একজন অটিজমের শিকার। প্রতি ৪২৩ ছেলের মধ্যে একজন, মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রতি ১ হাজার ২৬ জনের মধ্যে একজন। এই হার বাড়ছে। সারা বিশ্বে ৬১.৮ মিলিয়ন থেকে ৭৮ মিলিয়ন মানুষ অটিজমে আক্রান্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে ১ জন।

ঢাকায় অটিজম শিশুদের জন্য কিছু বিশেষায়িত স্কুল আছে, কিন্তু মান এক নয়, বেশিরভাগ ব্যয়বহুল। প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি খেলার মাঠ আছে, কিন্তু নামফলক ছাড়া কিছু নেই। দরকার সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা—শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বিহেভিয়র থেরাপি ও পুনর্বাসনসহ।

প্রয়োজন পর্যাপ্ত থেরাপি সেন্টার, স্পিচ থেরাপি, বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে, প্রতি জেলা-উপজেলায় সেবা সহজলভ্য করতে হবে। সুবর্ণ নাগরিক কার্ডসহ উদ্যোগ আছে, পরিধি বাড়ানো দরকার।

ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠান সামগ্রিক শিক্ষা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে পারে।

নিউরোডাইভারসিটি নতুন দর্শন। ‘নিউরোডাইভারসিটি’ জনপ্রিয় হচ্ছে। গায়ের রং বা ভাষার মতো মস্তিষ্কের কাজকরণও ভিন্ন হতে পারে। অটিজমকে ‘ত্রুটি’ নয়, ‘ভিন্নতা’ হিসেবে দেখা আধুনিক মানসিকতা। যথাযথ পরিবেশ দিলে তারা সীমাবদ্ধতা জয় করবে।

বাসন্তি সাহা কান্ট্রিফোকাল পয়েন্ট, বাংলাদেশ; এশিয়া দালিতস রাইটস ফোরাম-এডিআরএফ। ই–মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব