ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার খবর ২০২৬ সালের সঙ্গে মোটেও খাপ খায় না। এ যেন পুরোনো কোনো গল্প নতুন করে ফিরে এসেছে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা বা চাপ দিয়ে সরকার উৎখাত করা—এসব ৯/১১-এর পরবর্তী নব্যরক্ষণশীলদের পুরানো চিন্তাধারা। তখনকার নেতারা এ নিয়ে মাথা ঘামাতেন। কিন্তু আজকের কলেজপড়ুয়া তরুণরা তখন জন্মগ্রহণই করেনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা প্রায় সবাই ঘোষণা করেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সরকার বদলানোর যুদ্ধ আর হবে না। সবচেয়ে জোরালো স্বরে এ কথা বলেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে। কিন্তু এখন তাঁরাই সেই পুরোনো পথে আবার ফিরে এসেছেন।

‘ইউএসএ’ লেখা ক্যাপ পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এক রাতে ভিডিও বার্তায় ইরানে হামলার ঘোষণা দেন, তখন তাঁর ভাষণে পুরোনো দিনের ছাপই বেশি লাগে। ইরানের বর্তমান কোনো বড় হুমকি তিনি তুলে ধরেননি; বরং ১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গঠনের পর থেকে ইরানের কার্যকলাপের পুরোনো ঘটনা উল্লেখ করেন। যেমন ‘ডেথ টু আমেরিকা’ স্লোগান, মার্কিন দূতাবাস দখল—এসব বহুদিন আগের কথা তিনি বিস্তারিত বলে যান।

ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্প কি চার্চিলের মতো ‘মারাত্মক ভুল’ করতে যাচ্ছেন?

এসব বলার মাধ্যমে ট্রাম্প বোঝান যান, এ যুদ্ধ আজকের বা ভবিষ্যতের জন্য নয়—এটা পুরোনো হিসাব মিটানোর প্রয়াস। তিনি এই যুদ্ধকে এমনকি ‘ছোট্ট অভিযান’ বলেও উল্লেখ করেছেন।

এই যুদ্ধের অসঙ্গতি শুধু নেতাদের বয়সে নয়, আমেরিকার সমাজেও স্পষ্ট। ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে যুদ্ধের সমর্থন তুলনামূলকভাবে বেশি। বয়স কমলেই সমর্থন কমে যায়। ৩০ বছরের নিচে তরুণদের মধ্যে মাত্র পাঁচজনের একজন এই যুদ্ধ সমর্থন করে। তাই এটাকে অনেকে ‘বুমার যুদ্ধ’ বলছেন (১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী প্রজন্মকে ‘বুমার’ বলা হয়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে তাদের বয়স হবে প্রায় ৬২–৮০ বছর)।

অদ্ভুতভাবে, এই যুদ্ধবিরোধী মনোভাবই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ত্বরান্বিত করেছে। মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতি দ্রুত কমছে বলে ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হয়তো ভেবেছেন—এখনই শেষ সুযোগ। এখন যদি ইরানের সরকার না সরানো যায়, ভবিষ্যতে আর সম্ভব হবে না।

এই যুদ্ধ শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আরও গভীরভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। যুদ্ধবিরতি হলেও তা হবে নড়বড়ে। এদিকে উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলো (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার) খুব দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও শক্ত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইতে পারে।

এই যুদ্ধ একদিকে পুরোনো যুগের ‘শেষ চিৎকার’ মনে হয়, অন্যদিকে আশা-নিরাশার মিশ্র অনুভূতি জাগায়। নিরাশা এই কারণে যে এত শিক্ষা সত্ত্বেও এমন হামলা উচিত ছিল না। আশা এই কারণে—হয়তো ভবিষ্যতে এ ধরনের যুদ্ধ আর দেখা যাবে না। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের মতো হয়ে উঠতে পারে, যেমনটা ব্রিটেন ও ফ্রান্সের জন্য হয়েছিল। সেই সংকটে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাবের দীর্ঘ অধ্যায় শেষ হয়।

সুয়েজ সংকটে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার মিত্র দেশ ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ওপর চাপ দিয়ে যুদ্ধবিরতি আদায় করেছিলেন। কিন্তু আজকের বিশ্বে কোনো শক্তি আইজেনহাওয়ারের মতো আমেরিকাকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করতে পারবে না।

আমেরিকার কৌশলেই আমেরিকাকে ঘায়েল করছে ইরান।

এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে কতটা বিস্তৃত হয়েছে এবং কৌশলগতভাবে কতটা অগোছালো। মাত্র কয়েক সপ্তাহে তারা বিপুল পরিমাণ উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করেছে এমন এক অঞ্চলে, যাকে চার মাস আগে জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে কম গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছিল।

ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিপত্রে লেখা ছিল—মধ্যপ্রাচ্য আর আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্র নয়; যেখানে স্বাভাবিক পরিবর্তন আসে, সেখানে উৎসাহ দেওয়া হবে, বাইরে থেকে কিছু চাপানো যাবে না। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো পথই অবলম্বন করা হচ্ছে।

এর মধ্যে নতুন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে—ট্রাম্প ইরানে স্থলবাহিনী পাঠাতে পারেন। লক্ষ্য হতে পারে ইস্পাহানে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দখল বা খারগ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণ, যেখান দিয়ে ইরানের বেশিরভাগ তেল রপ্তানি হয়। এমন পদক্ষেপ নিলে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়বে এবং অঞ্চলে ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কা তীব্র হবে।

এই যুদ্ধ শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আরও গভীরভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। যুদ্ধবিরতি হলেও তা হবে নড়বড়ে। এদিকে উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলো (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার) খুব দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও শক্ত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইতে পারে।

ইরানের বর্তমান হামলা আরব দেশগুলোকে আতঙ্কিত করছে, আবার তারা আশঙ্কিত যে এক প্রতিশোধপরায়ণ ও কট্টরপন্থী ইরান ভবিষ্যতে কী করবে। ফলে তারা চাইবে, আবার হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তাদের পক্ষে যুদ্ধে নামুক। তখন আমেরিকান জনগণকে বলা হবে—শক্তি প্রদর্শনই শান্তির একমাত্র পথ।

কিন্তু যদি যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও গভীরভাবে জড়ায়, তাহলে এই পুরোনো ধাঁচের যুদ্ধই ভবিষ্যতের নিয়ম হয়ে উঠতে পারে।

  • স্টিফেন ওয়েরদাম কার্নেগি এন্ডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের আমেরিকান স্টেটক্রাফট প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো

    দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ