মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে। এর মধ্যে ভুয়া ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যও ছড়াচ্ছে। অনেকে এগুলোকে সত্যি মেনে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। এমনই এক ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজা সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছেন এমন এক বক্তব্য নিয়ে, যা মন্ত্রী বলেননি।

কুষ্টিয়া–৩ (সদর) আসনের এই সংসদ সদস্য সম্প্রতি এক ওয়াজ মাহফিলে তেল সংকট নিয়ে মন্ত্রীর কথিত বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া দেন।

আমির হামজা বলেন, ‘কত মন্ত্রী আজ কথা বলছে, তেল দিতে পারে না একটু সরি বলবে, না? বলছে হেঁটে চলাফেরা করতে পারেন না? শরীর ভালো থাকবে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত পিটানো দরকার শয়তানকে, কালকের দিন পরে তো দেখা হবে। কারণ, আমার পাশে সিট, ওই সামনে তাকালে দেখা হবে, আমি জিজ্ঞাসা করব চোখে চোখে, আপনি একটা কথা বললেন, তেল দিতে পারেন না সরি বলবেন, না। ও বলছে হাটাহাঁটি করলে শরীল ভালো থাকে, সংসদের মেইন গেট থেকে ভেতর পর্যন্ত এতটুকু পথ উনি হেঁটে আসে না, গেটে নামে; এরপর মানুষের ঘাড়ে হাত দিয়ে যায় ভেতরে। আর সে যদি এই কথা বলে, কথা হিসাব–নিকাশ করে বলা দরকার না?’

আমির হামজার ইউটিউব চ্যানেলে ওয়াজ মাহফিলের ১ ঘণ্টা ১৬ মিনিটের এই বক্তব্যে উক্ত কথাগুলো ১ ঘণ্টা ১২ মিনিট ৫০ সেকেন্ড থেকে ১ ঘণ্টা ১৩ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের মধ্যে রয়েছে।

লিংক: এখানে

যাচাইয়ে দেখা গেছে, ‘একটা মাস গাড়ি ছাড়া চলুন, হাঁটাহাঁটি করলে শরীর ভালো থাকে’—এই বক্তব্য মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বলে দাবি করে ২৩ মার্চ ‘চ্যানেল এআই’ নামক স্যাটায়ার ফেসবুক পেজ থেকে প্রথম একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে। ‘চ্যানেল আই’-এর লোগোর অনুকরণে তৈরি এই পেজের ফটোকার্ডটিই পরে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রাসঙ্গিক কী-ওয়ার্ড সার্চেও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর এমন কোনো বক্তব্যের নির্ভরযোগ্য তথ্য বা সংবাদ পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর রিউমার স্ক্যানার ও দ্য ডিসেন্ট ফ্যাক্ট চেক করে নিশ্চিত করে যে শেখ রবিউল আলমের নামে প্রচারিত এই মন্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা। পরে ‘চ্যানেল এআই’ সার্কাজম পেজ থেকে ফটোকার্ডটি সরিয়ে ফেলা হয়। তবু সংসদ সদস্য আমির হামজা এই ভুয়া বক্তব্যকে সত্যি ধরে ওয়াজ মাহফিলে মন্ত্রীর সমালোচনা করেন।

মির্জা ফখরুলের নামে ভুয়া মন্তব্য

একই তেল সংকট নিয়ে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভুয়া মন্তব্য ছড়ায়। সেখানে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন, ‘জ্বালানি মন্ত্রীর নিজস্ব সিন্ডিকেট সারা দেশে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।’

যাচাইয়ে জানা যায়, তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি। ‘আশার আলো’ নামক স্যাটায়ার পেজের ফটোকার্ড সম্পাদনা করে এই দাবি তৈরি করা হয়েছে। কোনো গণমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি।

শামা ওবায়েদও অপতথ্যের শিকার

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের নামেও ফেসবুকে একটি ভুয়া মন্তব্য ছড়ায়। সেখানে দাবি করা হয়—তিনি বলেছেন, ‘ইন্ডিয়ার সঙ্গে আমাদের চোখ নিচু করেই কথা বলতে হবে, এই যে যেমন এখন ইন্ডিয়ার হাতে–পায়ে ধরে তেল আনতে হচ্ছে, গাধার মতো ‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগান দিলেই তো হবে না, বুঝতে হবে যে ইন্ডিয়ার সঙ্গে ঝামেলা করলে আমাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যাবে।’

যাচাইয়ে দেখা যায়, এই মন্তব্য প্রথম ‘ব্যঙ্গবাজার’ নামক স্যাটায়ার পেজ থেকে প্রকাশিত হয়। পেজটির পরিচিতিতে বলা আছে, ‘ব্যঙ্গ যারা বুঝে তাদের জন্য।’ এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নিয়মিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে কাল্পনিক মন্তব্য প্রকাশ করা হয়। ২৫ মার্চ এই পোস্ট প্রকাশের পর অনেকে এটাকে সত্যি ধরে প্রতিক্রিয়া জানান, কিন্তু কোনো সংবাদমাধ্যমে তাঁর এমন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্পাদিত ফটোকার্ডে বিভ্রান্তিকর দাবি

‘ধানের গোডাউনে মিলল ৭০০ লিটার জ্বালানি তেল, বিএনপি নেতার গোডাউনে’—এমন শিরোনামে মোহনা টিভির নামে একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়।

যাচাইয়ে দেখা যায়, মোহনা টিভির আসল ফেসবুক পেজে ২৮ মার্চ ‘ধানের গোডাউনে মিলল ৭০০ লিটার জ্বালানি তেল’ শিরোনামে ফটোকার্ড প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সেখানে ‘বিএনপি নেতার গোডাউনে’ অংশটি ছিল না। সম্পাদনা করে এই অংশ যুক্ত করে প্রচার করায় বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।