সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় ফসলি জমিতে জলাবদ্ধতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুটি ভিডিও নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। প্রথম ভিডিওতে স্থানীয় কৃষকরা সংসদ সদস্যকে (এমপি) নিয়ে সমালোচনা করেছেন। পরের দিন আরেক ভিডিওতে তাঁদের তিনজন আগের বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।

ঘটনাটি ঘটেছে তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরসংলগ্ন শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের লামাগাঁও গ্রামে। তাহিরপুর সুনামগঞ্জ-১ আসনের (তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর) একটি উপজেলা। এ আসনের এমপি বিএনপির কামরুজ্জামান কামরুল।

প্রথম ভিডিওটি গত সোমবার রাতে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে লামাগাঁও গ্রামের কৃষক আজিজুল ইসলাম (৪২), আশ্বাব উদ্দিন (৫৫), রাসেল আহমদসহ (৪০) আরও একজনকে হাওরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখা যায়। তাঁরা জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষতির কথা তুলে ধরে এমপি কামরুজ্জামানের সমালোচনা করেন। একপর্যায়ে এমপিকে উদ্দেশ করে আজিজুল ইসলামকে কটূক্তি করতে শোনা যায়।

ভিডিওটি নিয়ে আলোচনা বাড়তেই গতকাল মঙ্গলবার রাতে ওই কৃষকদের মধ্যে তিনজনের আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাঁদের একটি ঘরে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে আগের বক্তব্যের জন্য এলাকাবাসী ও এমপির কাছে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়। প্রথম ভিডিওতে তাঁদের মুখে হাসি থাকলেও দ্বিতীয় ভিডিওতে তাঁদের চোখে–মুখে ভয়ের ছাপ লক্ষ করা যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় টাঙ্গুয়ার হাওরের বিভিন্ন এলাকার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। তবে একজন এমপিকে এভাবে কটূক্তি করা ঠিক হয়নি, এমন মতও দিয়েছেন অনেক বাসিন্দা। আবার কেউ কেউ ধারণা করছেন, কৃষকদের দিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভিডিওটি তৈরি করানো হয়ে থাকতে পারে।

লামাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ও শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ওয়ার্ড সদস্য মিসবাহ উদ্দিন বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালি এলাকায় পানি ঢুকে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এ কারণে কৃষকেরা ক্ষুব্ধ। পাশের কলমার হাওরের বাঁধে ঝুঁকি দেখা দিলে কয়েক দিন আগে গ্রামবাসী এমপির সঙ্গে দেখা করেন। তখন জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ মেরামতের জন্য দেড় লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। পরে স্থানীয় লোকজন কাজ করে ওই হাওরের ফসল রক্ষা করেন।

মিসবাহ উদ্দিন আরও বলেন, প্রথম ভিডিওটি প্রকাশ পাওয়ার পর গ্রামবাসীর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কৃষকেরাই এমপির কাছে ক্ষমা চাইতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে তাঁদের ক্ষমা চাওয়ার ভিডিওটি ধারণ করা হয়।

এ বিষয়ে আজ বুধবার দুপুরে কৃষক আজিজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা যায়নি। তিনি তখন হাওরে ছিলেন বলে জানা গেছে।

এমপি কামরুজ্জামান কামরুল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এ বিষয়ে কিছুই জানি না। পরে শুনেছি। একজন এমপির পক্ষে-বিপক্ষে মানুষের আলোচনা-সমালোচনা থাকতেই পারে। এ থেকে আমার অনেক কিছু শেখা এবং নিজেকে শোধরানোর সুযোগ আছে। আমি এটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখি।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক ও কলেজশিক্ষক ফজলুল করিমের ভাষ্য, দরিদ্র কৃষকদের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে এমন নোংরা রাজনীতি মোটেও কাম্য নয়। হাওরডুবিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ব্যক্তির কোনো গাফিলতি থাকলে মার্জিত ভাষায় প্রতিবাদ বা আন্দোলন করা যায়। যাঁরা এই দিশাহারা কৃষকদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে এমন বক্তব্য দিতে প্ররোচিত করলেন এবং কৃষকদের ক্ষমা চাইতে বাধ্য করলেন—দুটোই খতিয়ে দেখা দরকার।