রাজশাহীর আফরিন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি লেগেছে। ভোর থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন শাহাবুল আলম। সাড়ে ছয় ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও তিনি এখনও জ্বালানি তেল পাননি। এদিকে রোদও চড়তে শুরু করেছে।

শাহাবুল আলমের ছেলে মেহেদী হাসান তাঁর জন্য এক বোতল পানি ও ওষুধ নিয়ে এসেছেন। ওষুধ খাওয়ার জন্য শাহাবুল আলম লাইন ছেড়ে সামনে গেলেন, সেখানে দাঁড়ালেন মেহেদী। ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে ১০টা, বুধবার।

রাজশাহীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে এমন দৃশ্য এখন প্রায় নিত্যদিনের ব্যাপার। জ্বালানি তেলের জন্য মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের চালকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। কেউ ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন, কেউ আগের রাত থেকেই অপেক্ষায় আছেন।

নিউ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, ‘বাবা ভোর চারটায় এখানে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর প্রেশারের (উচ্চ রক্তচাপ) সমস্যা আছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ওষুধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে, কিন্তু লাইন ছাড়তে পারবেন না, ছাড়লেই আবার তেল পাওয়া যাবে না। তাই আমি পানি আর ওষুধ নিয়ে এসেছি।’

পেশায় ব্যবসায়ী শাহাবুল আলম জানান, এত ভোগান্তি সহ্য করতে হলে ভবিষ্যতে আর এভাবে লাইনে দাঁড়াতে চান না। তিনি বলেন, ‘তেলটা দরকারের ওপরই ব্যবহার করব। খুব বেশি প্রয়োজন হলে বাইক ব্যবহার করব, না হলে অটো বা রিকশায় চলাফেরা করব। এভাবে লাইনে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।’

আজ সকালে আফরিন ফিলিং স্টেশনের সামনে মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে—বিজোড় নম্বরের গাড়িই কেবল তেল পাবে, জোড় নম্বরের গাড়ি পাবে না। তবুও অনেক জোড় নম্বরের মোটরসাইকেল বা গাড়ি তেল পাওয়ার আশায় লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ ফোনে কথা বলছেন, কেউ মোটরসাইকেল রেখে পাশের দোকানে বসে চা খাচ্ছেন। তীব্র রোদে অনেকে বাইক লাইনে রেখে ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছেন, কিছুক্ষণ পরপর এসে সামনে এগিয়ে দিচ্ছেন। কেউ লাইনের সামনে গিয়ে দেখে আসছেন, কতদূর এগিয়েছে অপেক্ষার পালা।

রবিউল ইসলাম নামের এক ঠিকাদার বলেন, তানোর উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় তাঁর নির্মাণকাজ চলছে। কিন্তু তেলের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হওয়ায় সাইটে গিয়ে কাজ তদারকি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘৫০০ টাকার তেল এক দিনেই শেষ হয়ে যায়। আবার এসে লাইনে দাঁড়াতে হয়। এই কারণে সাইটে লেবাররা কীভাবে কাজ করছেন, সেটাও দেখতে পারছি না।’

ফিলিং স্টেশনের বাইরে প্রাইভেট কারের দীর্ঘ সারি আলুপট্টি থেকে পঞ্চবটী পর্যন্ত বিস্তৃত। বেশিরভাগ গাড়িতেই চালক নেই। তাঁরা গাড়ি লাইনে রেখে বাইরে বসে আছেন। মাঝেমধ্যে সামনে কোনো গাড়ি ঢুকলে এসে গাড়ি সরিয়ে দিচ্ছেন, কখনো ঝগড়াও হচ্ছে।

কাজী মোহাম্মদ শাহীন নামের এক চালক আক্ষেপ করে বলেন, ‘রাত আটটা থেকে লাইনে আছি। নামাজ পড়তে গিয়ে এসে দেখি সামনে ২৭টা গাড়ি চলে গেছে। কিছু গাড়ি ভিআইপি হিসেবে ঢুকে তেল নিয়ে চলে গেছে। শক্তি আছে যাঁদের, তাঁরা এসেই তেল নিয়ে যাচ্ছেন।’

দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা শরীফুল বলেন, কিছু প্রাইভেট কার গত রাত থেকেই লাইনে ছিল, সকালে লাইন আরও লম্বা হয়েছে। মোটরসাইকেলের লাইনও অনেক। প্রশাসনের গাড়ি ছাড়া অন্য কেউ লাইন ভেঙে ঢুকলে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আফরিন ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ফারুকুর রহমান বলেন, ‘গতকাল (মঙ্গলবার) আমরা ৯ হাজার লিটার তেল পেয়েছি। সেটাই আজ বিক্রি করছি। সকাল ১০টা পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার লিটার বিক্রি হয়ে গেছে।’

দিন বাড়ার সঙ্গে রোদের তাপ বাড়ছে, তেমনি দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে অপেক্ষার লাইন। কেউ ছায়ায় দাঁড়িয়ে, কেউ বাইকের পাশে বসে, কেউ দূরে গিয়ে দেখে আসছে সামনে কতটা পথ বাকি। তবে সবার চোখেই একই প্রশ্ন—আজ কি শেষ পর্যন্ত তেল মিলবে?