অবৈধ পথে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন রোধে ব্যর্থতার কারণে তরুণদের মৃত্যুর সिलসিলা থামছে না। লিবিয়া থেকে ইউরোপ যাত্রায় ভূমধ্যসাগরে অনাহারে বাংলাদেশি ২০ তরুণের মৃত্যু বা নিখোঁজের খবর আমাদের বেদনায় ভরিয়ে দেয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ‘ভাগ্য বদলানোর’ এই মরিয়া প্রয়াসের পেছনে দেশে তরুণদের জন্য যথেষ্ট কর্মসংস্থান ও মানসম্মত জীবনের অভাব রয়েছে। তবে আমরা মনে করি, মানব পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব এবং পাচারকারীদের বিচার না হওয়ায় এই ট্র্যাজেডি বারবার ঘটছে।

লিবিয়া হয়ে গ্রিসে যাত্রায় প্রাণ হারানো ২৩ বছরের যুবক শায়েক আহমেদের ঘটনা এই অবৈধ অভিবাসনের ভয়াবহতা প্রকাশ করে। প্রলোভনে পড়ে সুনামগঞ্জের এই তরুণের দরিদ্র পরিবার শেষ সম্পদ গরু ও জমি বিক্রি করে ১২ লাখ টাকা দালালদের দিয়েছিল। গত ২১ মার্চ রওনা নেওয়া রাবারের নৌকা ভূমধ্যসাগরে পথভ্রষ্ট হয়ে ছয় দিন ভেসেছিল। খাবার শেষ হয়ে যাওয়ায় অনাহারে তার মৃত্যু হয়। এই যাত্রায় সুনামগঞ্জের ১২ তরুণ প্রাণ হারিয়েছে, তাদের লাশ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের অভিবাসনপ্রত্যাশী তরুণদের কাছে লিবিয়া মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছে। নজরদারি না থাকায় উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে দালাল চক্র তরুণদের সহজে ফাঁদে ফেলছে। মানব পাচার এখন বিস্তৃত আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্কে রূপ নিয়েছে। একদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতছে, অন্যদিকে তরুণরা সমুদ্রে ডুবে, অনাহারে মরছে অথবা বিদেশী কারাগারে বন্দী। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্য বলছে, এই বহুস্তরীয় চক্র কতটা মুক্তভাবে কার্যকলাপ চালাচ্ছে। গত এক বছরে অবৈধ পথে ১৭ হাজার বাংলাদেশিকে ইতালিতে পাঠানো হয়েছে।

শুধু ইতালি বা গ্রিস নয়, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়াতেও মানব পাচার চক্র সক্রিয়। বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার পথেও বাংলাদেশি তরুণদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। উচ্চ বেতনের প্রলোভনে রাশিয়ায় পাঠানো তরুণদের ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে।

এত আলোচনা সত্ত্বেও মানব পাচারকারীদের বিচার না হওয়ায় অবৈধ অভিবাসন কমছে না, বরং বাড়ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলা হয় না, আর মামলা হলেও বিচারের হার নগণ্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২০ থেকে ২০২৪—এই পাঁচ বছরে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে প্রায় সাড়ে চার হাজার মামলা হলেও ৯৪–৯৫ শতাংশ আসামি খালাস পায়। এই বিচারহীনতাই পাচারকারীদের বেপরোয়া করে তুলেছে।

এটা সত্য যে আন্তর্জাতিক সমন্বয় ছাড়া মানব পাচার সম্পূর্ণ রোধ সম্ভব নয়। তবে দেশি দালাল চক্রকে বিচারের মুখোমুখি করে কঠোর শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করলে তরুণদের মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কমানো যায়। এর জন্য প্রথমে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। অবৈধ অভিবাসনে বাংলাদেশি তরুণদের এই মৃত্যুযাত্রা যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে।