বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ৪-১ ইতালি (টাইব্রেকার)
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ১-১ ইতালি (অতিরিক্ত সময়)
জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা তখন নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে, মাথায় হাত দিয়ে। কিছু দূরে গ্যালারির দর্শকদের সঙ্গে উৎসবে মেতেছেন এসিমির বাজরাকতারভিচ। মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে টাইব্রেকারে তার গোলই ইতালির বিশ্বকাপ ট্র্যাজেডির ‘তৃতীয় কিস্তি’ লিখে দিয়েছে।
জেনারো গাত্তুসোর চোয়াল শক্ত। ক্যারিয়ারজুড়ে লৌহকঠিন ফুটবলের মতোই ভেতরের আবেগ প্রকাশ করেননি ইতালি কোচ। শিষ্যদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। কিন্তু সবাই গাত্তুসো নন। কেউ কেউ আলেসান্দ্রো বাস্তোনিও হন। ইতালি সেন্টার ব্যাক নিজেকে কীভাবে সান্ত্বনা দেবেন! ১-০ গোল করে এগিয়ে থাকতে প্রায় নিশ্চিত গোল বাঁচাতে ফাউল করে লাল কার্ড দেখেছেন। ধারাবাহিকতায় তখন বলা হচ্ছিল, এটাই কি শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হয়ে দাঁড়াবে?
বাস্তোনি বেরিয়ে আসার পর বসনিয়া একজন বেশি নিয়ে মরণকামড় দিয়েছে। দুই প্রান্ত থেকে একের পর এক ক্রস ফেলেছে ইতালির বক্সে। ৭৯ মিনিটে বসনিয়ার হয়ে হারিস তাবাকোভিচের সমতাসূচক গোলটি তারই ফল। কে জানে, বাস্তোনি থাকলে হয়তো ১২ বছরের বিশ্বকাপ-বিরহ ইতালি কাটাতে পারত!
তবে ৪১ মিনিটে আমর মেমিচকে বাস্তোনি ট্যাকল করে না থামালে সমতাসূচক গোলটি বসনিয়া তখনই হয়তো পেয়ে যেত। বাস্তোনির কাছে অন্তত এতটুকু সান্ত্বনা আছে। পিও এসপোসিতো ও ব্রায়ান ক্রিস্তান্তের তা নেই। টাইব্রেকারে তারা লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি। এসপোসিতো পোস্টের ওপর দিয়ে মারেন। ক্রিস্তান্তের শট ক্রসবারে লেগে ফেরে। ইতালি তবু দোন্নারুম্মায় ভরসা রেখেছিল।
ক্যারিয়ারে পেনাল্টি শুটআউটে তার হার মাত্র একটি, ম্যাচেও ছয়-সাতটি দারুণ সেভ করেছেন দোন্নারুম্মা। কিন্তু ইতালির ফেরার আশায় তিন কাঠের নিচে শেষ ‘ভরসা’ হিসেবে দাঁড়ানো দোন্নারুম্মাও পারলেন না। বসনিয়ার চারটি লক্ষ্যভেদ যেন ইতালিয়ান ট্র্যাজেডির শেষ পরিচ্ছেদ।
জেনিকার বিলিনো পোলজে স্টেডিয়ামে প্লে অফ ফাইনালে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত স্কোরলাইন ছিল ১-১। অতিরিক্ত সময়েও তাই। টাইব্রেকারে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ৪-১ গোলের জয়ে বলকান অঞ্চলের দেশটি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। ইতালিকে মেনে নিতে হয়েছে নিদারুণ বাস্তবতা। বিশ্বকাপে সাবেক চ্যাম্পিয়নদের মধ্যে ইতালিই একমাত্র, যারা টানা তিনবার যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ। বাস্তোনি, এসপোসিতো ও ক্রিস্তান্তেদের দুঃখ তাই অমোচনীয়। তারা জানেন, রোমে অনেকেরই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় ইতালি চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন!
এমন নয় যে ইতালি বাজে খেলেছে। ১৫ মিনিটে বসনিয়ার গোলকিপার নিকোলা ভাসিল চাপ সইতে না পেরে ভুল জায়গায় পাস দেন। নিকোলা বারেল্লা সেটা ধরে সামনে ফাঁকা জায়গায় ময়েজ কিনকে পাস দিতেই ঠান্ডা মাথায় ফিনিশ করেন ইতালিয়ান স্ট্রাইকার। ইতালির হয়ে টানা ছয় ম্যাচে গোল করলেন কিন। তারপর বাস্তোনির লাল কার্ড দেখার পর ৭৯ মিনিটে হজম করা গোলটিতে ভাগ্য সহায় হয়নি। জটলার মধ্যে দোন্নারুম্মা গোললাইন থেকে সেভ করলেও ফিরতি বলে পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জ শটে গোল করেন তাবাকোভিচ। এই গোল আসলে হওয়ারই কথা ছিল। ১০ জন নিয়ে কতক্ষণ একের পর এক ক্রস ঠেকানো যায়! বসনিয়া কখন, কেমন খেলেছে সেটা একটি পরিসংখ্যানেই পরিস্কার। এডেন জেকোরা শট নিয়েছেন মোট ৩০টি, এর মধ্যে ১১টি পোস্টে, বাস্তোনি লাল কার্ড দেখার আগে যেটা মাত্র ২টি।
২০১৭ সালে সুইডেনের বিপক্ষে প্লে অফে হেরে পরের বছর বিশ্বকাপ খেলেনি ইতালি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে উত্তর মেসিডোনিয়ার কাছে হারে খেলতে পারেনি। এবার ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৭১তম বসনিয়ার কাছে হেরে বিশ্বকাপে ফেরা হলো না ‘আজ্জুরি’দের। অপেক্ষা করতে হবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। তবে বিশ্বকাপে এবারও ইতালির নীল উৎসব না থাকলেও নীল রংটা কিন্তু থাকছে। ঘরের মাঠে নীল জার্সি পরে নামা বসনিয়া বিশ্বকাপে ফিরল ১২ বছর পর। ইতালির মতোই ২০১৪ আসরে সর্বশেষ খেলে তারা। সেটা তাদের অভিষেক বিশ্বকাপ। অর্থাৎ বসনিয়া দীর্ঘ এক যুগের অপেক্ষা ঘোচাতে পারল, কিন্তু ইতালি পারল না!
গাত্তুসো এসব ভেবেই সম্ভবত শেষ পর্যন্ত চোখের পানি আটকাতে পারেননি। ভেজা চোখে ইতালি কোচ বলেন, “এটা কষ্টের। কারণ এটা (বিশ্বকাপে ওঠা) আমাদের নিজেদের জন্য, গোটা ইতালির জন্য প্রয়োজন ছিল। এই ধাক্কা হজম করা সত্যিই কঠিন।”






