বাংলাদেশ ‘তারুণ্যের বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু বিশাল তরুণ জনশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি কি? প্রতি বছর হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ক্ষতি।

এই সমস্যার সমাধানে ‘ড্যাফোডিল মডেল’ কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। গত ১৬ বছর ধরে ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন এই মডেলের মাধ্যমে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। এটি এখন শুধু দাতব্য কাজ নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক দর্শন হিসেবে অনুসরণীয়।

সাধারণত দান বা জাকাতকে সাময়িক সহায়তা মনে করা হয়। কিন্তু ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন এটাকে ‘মানবিক পুঁজি বিনিয়োগ’ (Human Capital Investment) হিসেবে দেখছে।

গত ১৬ বছরে এই মডেলে ২৭৯ জন শিক্ষার্থীকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০২ জন এখন সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। এভাবে মেধায় বিনিয়োগ বহুগুণ ফল দিচ্ছে।

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের এক হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান রফিকুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। তার মেধা ছিল প্রখর, কিন্তু মাধ্যমিকের পর পড়াশোনা চালানো অসম্ভব ছিল। বাবা দিনমজুর, যাঁর আয়ে দুবেলা খাবার জুটানোও কঠিন।

এই সংকটে ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন তার জীবনে আলো এনে দিল। মেধায় বিনিয়োগের মডেলে তাকে টিউশন ফি ছাড়াও আবাসন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া হয়। ড্যাফোডিল মডেলে সে শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, ‘সফট স্কিল’ এবং ‘প্রবলেম সলভিং’ শিখেছে।

আজ রফিকুল একটি শীর্ষস্থানীয় সফটওয়্যার কোম্পানিতে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার। রফিকুল বলেন, “ড্যাফোডিল যদি আমাকে কেবল কিছু টাকা “দান” করত, তবে হয়তো আমি বড়জোর একটি ডিগ্রি পেতাম। কিন্তু তারা আমার মেধার ওপর “বিনিয়োগ” করেছে এবং আমাকে একজন দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।”

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘ডিগ্রি আছে কিন্তু দক্ষতা নেই’—এই সমস্যা বড়। ড্যাফোডিল মডেল এর সমাধান দিচ্ছে। গত ১৬ বছরে ১৬টি ব্যাচে ২৭৯ জনকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৯০ জন শিক্ষার্থী সুবিধা নিচ্ছেন এবং ১৮৯ জন ইতিমধ্যে শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন।

শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক মুক্তি—এই চক্রের মাধ্যমে অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে সম্পদে রূপান্তরিত করা হচ্ছে।

অনেক প্রতিষ্ঠান CSR পালন করে। কিন্তু ড্যাফোডিল গ্রুপের ‘One-Third Social Commitment’ অনন্য। তাদের আয়ের বড় অংশ সমাজ সংস্কারে ব্যয় হয়। ‘জীবিকা’ (Jeebika) প্রকল্পে কর্মসংস্থান এবং ‘DISS’-এর মাধ্যমে গবেষণা ও পরিবর্তনের কাজ চলছে। ফাউন্ডেশনের মূল কার্যক্রম:

· শিক্ষা সম্প্রসারণ: দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি এবং বিনা মূল্যে শিক্ষার সুযোগ।

· ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সুদমুক্ত ঋণসুবিধা।

· স্বাস্থ্যসেবা: সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা।

· দক্ষতা উন্নয়ন: আইটি প্রশিক্ষণ ও ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণ।

সব কার্যক্রম ডিজিটাল অটোমেশন সিস্টেমে চলে। অনলাইন আবেদন থেকে সাক্ষাৎকার ও ডেটা ব্যবস্থাপনা—সব স্বচ্ছ। শিক্ষার্থীদের ‘Growth Mindset’ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তারা প্রতিকূলতা জয় করে উদ্যোক্তা হয়।

বিত্তবানদের প্রশ্ন: দান নাকি মেধায় বিনিয়োগ? এক শিক্ষার্থীতে বিনিয়োগ মানে এক পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি।

ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ড. মো. সবুর খান বলেন, “দান নয়, মেধায় বিনিয়োগ—এটাই হোক বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন দর্শন। ড্যাফোডিল যে পথ দেখিয়েছে, সেই পথে হাঁটলে আগামীর বাংলাদেশ হবে মেধা ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ এক অনন্য জনপদ। আমাদের লক্ষ্য কেবল আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়, বরং একটি দক্ষ ও স্বনির্ভর প্রজন্ম গড়ে তোলা।”