যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলায় সাধারণ ইরানিরা হারানোর হাহাকারে ভুগছেন, যখন আক্রমণকারীরা সাফল্যের গর্ব করে। তেহরানের রাস্তায় বোমার ধ্বংসলীলায় জীবিকা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে সবার।

যুদ্ধ এনেছে ধ্বংস, আতঙ্ক, আর্থিক ধস আর বছরের পর বছরের শ্রমে গড়া স্বপ্নের সমাপ্তি।

৪০ বছর বয়সী আহমদ রেজা তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ছোট চশমার দোকান চালাতেন। এক বিমান হামলায় তাঁর সবকিছু ধ্বংস হয়েছে। ‘আমার সারা জীবনের সব সঞ্চয় শেষ। বছরের পর বছর ধরে যা কিছু গড়ে তুলেছিলাম, তা চোখের পলকে বিলীন হয়ে গেল,’ বলেন তিনি।

আমার সারা জীবনের সব সঞ্চয় শেষ। বছরের পর বছর ধরে যা কিছু গড়ে তুলেছিলাম, তা চোখের পলকে বিলীন হয়ে গেল।

আহমদ রেজা, তেহরানের চশমা ব্যবসায়ী

আহমদের অনুমান, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫০ বিলিয়ন রিয়াল, যা প্রায় ১ লাখ মার্কিন ডলার। তিনি বলেন, ‘আমি যেসব চশমা আমদানি করেছিলাম, তার সবই পুড়ে ছাই। এখন আমার কাছে একগাদা চেক ছাড়া আর কিছুই নেই। জানি না, কীভাবে এগুলোর টাকা পরিশোধ করব।’

তাঁর দোকানের আশপাশে কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না। কেন এলাকাটি লক্ষ্য হলো, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। ‘কোনো ঘাঁটি নেই, কোনো পুলিশ স্টেশন নেই, কিচ্ছু নেই। এটা তো ছিল স্রেফ একটি বাণিজ্যিক এলাকা, যেখানে মানুষ চশমা কিনতে আসত।’

‘তারা (যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল) বলেছিল যে তারা আমাদের জন্য স্বাধীনতা নিয়ে আসছে। স্বাধীনতার রূপ কি তবে এ–ই?’ তিক্ত স্বরে বলেন আহমদ।

বোমাবর্ষণে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো ক্রমশ আক্রান্ত হচ্ছে। ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতালের মতো হাজারো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

আমরা এখন কী করব জানি না। আমাদের মালিক জায়গাটা চালু রাখতে অনেক পরিশ্রম করেছিলেন। এখন আমরা সবাই বেকার।

মিনা, তেহরানের পারলারকর্মী

যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে প্রবেশ করেছে। অনেক ইরানি বলছেন, হামলার ধরন বদলে গেছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তু আঘাত করছেন। কিন্তু ইরানিরা দেখছেন, বেসামরিক এলাকায় আঘাত বাড়ছে।

পশ্চিম তেহরানের বিউটি পারলারে কাজ করতেন মিনা। বিমান হামলায় সেটি ধ্বংস। আগের রাতে তিনি বলেন, ‘আমি ঘুমাতে পারছিলাম না। জেট বিমানের শব্দ এত কাছ থেকে আসছিল যেন কানের পাশেই কিছু একটা ভোঁ–ভোঁ করছে।’

‘রাতভর সেগুলোর আসা-যাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, ওগুলো ঠিক আমাদের মাথার ওপরই ঘুরছে।’ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পরও পারলারে ভিড় ছিল। নওরোজের কয়েকদিন বাকি ছিল। ‘আমাদের প্রচুর অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। উৎসবের জন্য মানুষ নিজেকে প্রস্তুত করতে চেয়েছিল।’

পরদিন সব শেষ। ‘আমি যখন পৌঁছালাম, দেখলাম পুরো ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সব আয়না ভেঙে চুরমার, চেয়ার আর হেয়ার ড্রায়ারের টুকরাগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিল।’ এখন মিনা অনিশ্চয়তায়। নখ পরিচর্যায় দক্ষ তাঁর হাতে গ্রাহকের ঠাসা সূচি ছিল। পারলারের আশপাশে কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না।

জীবন যখনই আমাদের ছিটকে ফেলে দেয়, আমরা আবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এরপর মনে হয় যেন কেউ আবারও আমাদের গলা চেপে ধরেছে।

নাগমেহ, তেহরানের উদ্যোক্তা

২৯ বছরের নাগমেহ তিন বন্ধুর সাথে পোশাকের ছোট ব্র্যান্ড চালু করেছিলেন। ফ্যাশন ও টেক্সটাইল ডিজাইনে পড়াশোনা করেছেন বছরের পর বছর। ‘আমরা চার তরুণী নিজেদের জন্য কিছু একটা করার চেষ্টা করছিলাম।’ নিষেধাজ্ঞায় আমদানি সীমিত হওয়ায় সুযোগ দেখেছিলেন। ‘মানুষ আর চাইলেই সহজে বিদেশি ব্র্যান্ডের জিনিসপত্র কিনতে পারছিল না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করব।’ তেহরানের পশ্চিমে স্টুডিও ধ্বংস। ‘অন্য একটি ভবনে হামলার ফলে ছিটকে আসা আগুনের স্ফুলিঙ্গ সবকিছুতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। আমাদের সব কাজ, নকশা, পণ্য—সবকিছুই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’

তাঁরা ক্ষতির হিসাব করতে পারছেন না। ‘আমরা বিপর্যস্ত,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন নাগমেহ, ‘একেবারে বিপর্যস্ত।’

তেহরানে এমন গল্প সাধারণ হয়েছে। উত্তর তেহরানের ৬৭ বছরের হাসান পারিবারিক রেস্তোরাঁ হারিয়েছেন। ‘আমার বাবা ৩৫ বছর আগে জায়গাটি চালু করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর আমি এটি চালিয়ে আসছিলাম। পুরোটাই এখন ধ্বংসস্তূপ।’ তিনি মনে করেন, হামলার ধরন বদলেছে কারণ প্রথম আঘাতে ইরান ভাঙেনি। ‘তারা কি সত্যিই ভেবেছিল যে বোমা পড়ার সময় মানুষ প্রতিবাদ করতে নামবে?’ ‘আমার তিনটি সন্তান আছে, এখন আমি কীভাবে তাদের ভরণপোষণ করব?’

আমার বাবা ৩৫ বছর আগে এটি চালু করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর আমি এটি চালিয়ে আসছিলাম। পুরোটাই এখন ধ্বংসস্তূপ।

হাসান, তেহরানের রেস্তোরাঁমালিক

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তেহরান ভয় ও ক্ষোভে ঢাকা। মানুষ জানে না কতদিন চলবে। মিনা বলেন, ‘হয়তো আমার এটা বলা উচিত নয়। কিন্তু মাঝেমধ্যে আমার নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয় যে আমার বাড়িতে অন্তত আঘাত হয়নি।’ ‘এ যুদ্ধ যেন দ্রুত শেষ হয়।’

ইরানিদের কাছে এখন যুদ্ধ টিকে থাকার লড়াই। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমিক, তরুণ উদ্যোক্তারা আর্থিক-মানসিকভাবে দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে। ‘আমরা আটকা পড়ে গেছি,’ বললেন নাগমেহ, ‘এ যুদ্ধ আমরা চাইনি, অথচ আমাদের তার মধ্যেই থাকতে হচ্ছে।’