দেশে মার্চ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার জেরে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে এ ধরনের সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল মাত্র ২। এই মাসে সহিংসতার ঘটনা আগের মাসের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) মার্চ মাসের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যালোচনা করে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতি মাসে দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং নিজস্ব তদন্তের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করে এমএসএফ। আজ মঙ্গলবার মার্চ মাসের প্রতিবেদন গণমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে বলে এমএসএফ জানিয়েছে। এসব ঘটনার বেশিরভাগের পেছনে সরকারি দল বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং আধিপত্য বিস্তারের প্রভাব রয়েছে। এতে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে।
এমএসএফের তথ্যমতে, মার্চে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৬টি ঘটনায় ৪০৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে নারীসহ ১৪ জন নিহত এবং ৩৯০ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ১০ জন, জামায়াতের ২ জন, ১ জন নারী এবং ১ জনের রাজনৈতিক পরিচয় সঠিকভাবে জানা যায়নি।
ফেব্রুয়ারিতে ১৮টি সহিংসতার ঘটনায় ২ জন নিহত এবং ১১৩ জন আহত হয়েছিলেন।
কারা হেফাজতে মৃত্যু ১১ জনের
এক মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কারা হেফাজতে ১১ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতেও ২ জনের মৃত্যু ঘটেছে বলে এমএসএফ জানিয়েছে।
বন্দীদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হেফাজতের মৃত্যুর কারণ তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনলে এ ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে এমএসএফ মনে করে।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে
সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চে ২৮৯টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে; যা গত মাসের তুলনায় ৩৬টি বেশি। এর মধ্যে ধর্ষণ ৪৮টি, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১৫টি, ধর্ষণ ও হত্যা ৩টি। ধর্ষণের শিকার ৪ জন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী।
নারী ও শিশুদের ওপর ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো ঘটনা যে হারে বেড়েছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ সময়ে ধর্ষণচেষ্টা, যৌন নিপীড়ন, আত্মহত্যা, হত্যা এবং জীবিত বা মৃত নবজাতক উদ্ধারও বেড়েছে বলে এমএসএফ জানায়।
এমএসএফের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। রাজনৈতিক সহিংসতা আগের চেয়ে বেড়েছে এ মাসে। এর মধ্যে শাসক দলের মধ্যেই বেশি ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ মাসে কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে অনেকগুলো। নারীর প্রতি সহিংসতাও বেড়েছে। এ সবই মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনমনের চিত্র তুলে ধরে।”
মতপ্রকাশে হস্তক্ষেপ
মার্চে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা কিছুটা কমলেও সংবাদ সংগ্রহে বাধা দিতে সরকারি দলের সম্পৃক্ততা গণমাধ্যমের জন্য হুমকি তৈরি করেছে বলে এমএসএফ মনে করে।
মার্চে ১০টি ঘটনায় ৩০ জন সাংবাদিক দেশের বিভিন্ন জেলায় পেশাগত কাজের সময় হামলা, হয়রানি, হুমকি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার ৫টিতে বিএনপি, ১টিতে বহিষ্কৃত বিএনপির কর্মী, ১টিতে মব, ১টিতে ডাক্তার, ১টিতে বিআইডব্লিউটিসির কর্মচারী ও ১টিতে ভুয়া ফেসবুক আইডির সম্পৃক্ততা ছিল।
অজ্ঞাতনামা লাশ
মার্চে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে ৫৩টি। এর মধ্যে ২ জন শিশু, ২ জন কিশোর, ১৩ জন নারী ও ৩৬ জন পুরুষ। অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনা জনজীবনের নিরাপত্তাহীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতন
গণমাধ্যম ও এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী মার্চে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ৪টি এবং আদিবাসী নির্যাতনের ৪টিসহ মোট ৮টি ঘটনা ঘটেছে। সনাতনী সংখ্যালঘুদের ১০টি মন্দিরে চুরি হয়েছে।
এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর অপব্যবহার, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর গ্রেপ্তার, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, অস্বাভাবিক ও ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে নিহত, সীমান্তে হত্যা, দুর্বৃত্ত কর্তৃক নিহত, গণপিটুনি ও মব সন্ত্রাসের ঘটনা অনবরত ঘটছে বলে প্রতিবেদনে এমএসএফ জানায়।
জননিরাপত্তায় সরকারের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় নাগরিকদের জীবনে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক চর্চা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমমর্যাদা ও নাগরিক জীবনে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে কর্তৃপক্ষের কাছে এমএসএফ জোর দাবি জানায়।
বড় উদ্বেগ সড়কের মৃত্যু
এমএসএফ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বরাতে জানায়, ১৭ থেকে ২৬ মার্চ ২০২৬ ভোর পর্যন্ত ১০ দিনে সারা দেশে ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
মহাসড়কগুলোতে বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিং, অতিরিক্ত যাত্রী, বিশ্রামহীন চালকের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। হাইওয়ে পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। ফলে মহাসড়কে অটোরিকশা, ভ্যান ও সিএনজির অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে।






