রাজধানীতে তেলের সংকটে মোটরসাইকেলচালক মো. রুবেল সকাল ৯টায় বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়ান। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে রাইড শেয়ার ও পণ্য সরবরাহের কাজ করেন তিনি। বেলা সাড়ে ১১টায় তাঁর একটি পার্সেল ডেলিভারি করার কথা ছিল। কিন্তু দুপুর সাড়ে ১২টায়ও তিনি লাইনে অপেক্ষা করছিলেন, ফলে পার্সেল দিতে পারেননি।
সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে এসেছেন রুবেল। আজ মঙ্গলবার সেখানেই তাঁর সঙ্গে কথা হয় মুক্তকণ্ঠের। রুবেল বলেন, তিনি ঢাকার হাজারীবাগ এলাকায় থাকেন। তেল নেওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন সকাল আটটায়। পথে ধানমন্ডি থেকে একজন যাত্রী নিয়ে মহাখালী নামিয়েছেন। সেখান থেকে সকাল ৯টায় ট্রাস্ট পাম্পের লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু সাড়ে তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল নিতে পারেননি।
পণ্য ডেলিভারি করতে না পারায় রুবেল বলেন, ‘রাইড শেয়ারের পাশাপাশি আমি অ্যাপের মাধ্যমে পণ্য ডেলিভারি করি। গতকাল রাতে একটি পার্সেলের অর্ডার পাই। আজ বেলা ১১টার মধ্যে ডেলিভারি করার কথা ছিল। কিন্তু তেল নিতে না পারায় এখন পর্যন্ত পার্সেল ডেলিভারি দিতে পারিনি। ডেলিভারি অফিস থেকে বারবার ফোন দিচ্ছে।’
রাকিব ইসলামও রুবেলের মতোই দুর্ভাগ্যের শিকার। তিনি মোহাম্মদপুরের ফৌজিয়া হেলদি ফুড প্রতিষ্ঠানের পিকআপ চালান। প্রতিষ্ঠানটি রাজধানীর বিভিন্ন সুপারশপে দই সরবরাহ করে। সকাল থেকে বেশ কয়েকটি সুপারশপে দই ডেলিভারি করার কথা ছিল। কিন্তু তেলের লাইনে অপেক্ষায় তা সম্ভব হয়নি।
আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ব্যক্তিগত গাড়ির সারিতে আড়াই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন রাকিব। পাম্পটিতে তেল না থাকায় গতকাল সোমবার রাত থেকে বিক্রি বন্ধ। তবু তিনি লাইন ছাড়েননি। রাকিব বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের একটিই গাড়ি। সকালে ঢাকার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দই ডেলিভারি করার কথা ছিল। কিন্তু গাড়িতে তেল না থাকায় দিতে পারিনি। তেল পাওয়ার পর ডেলিভারি দিতে যাব। কিন্তু কখন তেল পাব, জানি না। পাম্প তো বন্ধ, তারপরও সকাল ৯টা থেকে অপেক্ষা করছি। সিরিয়ালে এগিয়ে আছি, তাই আর লাইন ছেড়ে যাচ্ছি না।’
একই ফিলিং স্টেশনে সকাল ৭টায় ব্যক্তিগত গাড়ির সারিতে দাঁড়ান চালক আনোয়ার হোসেন। সারির শেষ প্রান্ত তখন জিয়া উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি তখনো জানতেন না পাম্প বন্ধ। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর জানতে পারেন। কিছু গাড়ি সরে যাওয়ায় সামনে এগিয়ে এসেছেন, তাই লাইন ছাড়েননি। বেলা পৌনে ১১টায় কথা হয় আনোয়ারের সঙ্গে। তিনি তখন গাড়িতে ক্লান্ত হয়ে রাস্তার পাশের গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।
আনোয়ার বলেন, ‘আমার গাড়ির মালিক বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক। তিনি কয়েক দিন ধরে অসুস্থ। আজকে তিনি হাসপাতালে যাননি। তাই ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমি তেলের লাইনে দাঁড়িয়েছি। সন্ধ্যা হলেও আজকে তেল নিতেই হবে।’
তালুকদার ফিলিং স্টেশনের অপারেটর শামীম ইসলাম বলেন, গতকাল রাত ১০টা থেকে পাম্পে তেল নেই। তাই বিক্রি বন্ধ রয়েছে। তেল আনতে গাড়ি ডিপোতে গেছে। এলেই বিক্রি শুরু হবে। একাধিকবার চালকদের তেল না থাকার কথা জানানো হয়েছে। তারপরও তাঁরা লাইনে অপেক্ষা করছেন।
তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল কেনার অপেক্ষায় ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। মোটরসাইকেলচালকেরা এসে পাম্প বন্ধ পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বেলা সাড়ে ১১টায় এই পাম্পের সারিতে ১৫০টির মতো ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল। দীর্ঘ অপেক্ষায় ক্লান্ত চালকরা গাড়িতে ঘুমাচ্ছিলেন বা ফুটপাতের গাছের ছায়ায় গল্প করছিলেন।






