বন, পাহাড় ও প্রাকৃতিক স্থানগুলো আমার কাছে রত্নভান্ডারের মতো। এখান থেকে মণিমানিক্য সংগ্রহ করাই আমার নেশা। পাহাড় থেকে হাওর, হাওর থেকে বিল, বিল থেকে বনে ছুটছি নিরন্তর। এভাবেই একদিন পৌঁছালাম বান্দরবানের লামায়, সুনির্দিষ্টভাবে কোয়ান্টামে। এই প্রতিষ্ঠানের তরুণ পরিবেশকর্মীরা কয়েক বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে আধখাওয়া ন্যাড়া পাহাড়কে সবুজ করে তুলেছেন। স্থানীয় উদ্ভিদের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া প্রজাতিও যোগ করেছেন। এভাবে গড়ে উঠেছে এক চমৎকার উদ্ভিদরাজ্য। এখানে বারবার এসেছি, প্রতিবারই নতুন গাছের সাক্ষাৎ হয়েছে। সেসবের মধ্যে দুটি উদ্ভিদ নিয়ে আজ বলব।

গরু-মারা বা নিশাম্বা

ডিসেম্বর মাস। কোয়ান্টামের শৈলসারিতে শীতের আমেজ। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম ঘুরে দেখছিলাম। আবাসিক এলাকা থেকে হারবেরিয়াম ঘরে যাওয়ার পথে চোখ আটকে গেল একগুচ্ছ ফুলে। শীতকালে বড় গাছে ফুল কম থাকে, তাই হয়তো এটি তার সৌন্দর্য মেলে ধরেছে। গাছটির স্থানীয় নাম গরু-মারা বা নিশাম্বা। সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরহরিত অরণ্যে প্রাকৃতিকভাবে জন্মালেও সংখ্যা অনেক কম।

নিশাম্বা (Crypteronia paniculata) বড় বৃক্ষ, ২৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। কাণ্ড ডিম্বাকার, বিস্তৃত; বাকল ধূসর বা বাদামি, ভেতরটা লালাভ বাদামি। পাতা প্রতিমুখ, ৬ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার লম্বা, পুরু ও গাঢ় সবুজ। ছড়ার মতো ফুলগুলো শাখার প্রান্তে গুচ্ছাকারে ঝুলে থাকে। ফুল সবুজাভ সাদা, আড়াআড়ি তিন সেন্টিমিটার, পুষ্পবৃন্ত দুই মিলিমিটার লম্বা, মঞ্জরিপত্র এক মিলিমিটার লম্বা, রৈখিক ও রোমশ। বৃতিনল খাটো, এক মিলিমিটার লম্বা। পাপড়ি অনুপস্থিত। পুংকেশর দুই মিলিমিটার লম্বা। ফুল ও ফলের মৌসুম নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত।

এই গাছের কাঠ লালচে বাদামি, ভারী ও শক্ত। গাড়ির চাকা, রেলের স্লিপার ও বাড়ি নির্মাণের সরঞ্জাম হিসেবে কাজে লাগে। কচিপাতার স্বাদ তেতো। ইন্দোনেশিয়ায় সুগন্ধের জন্য এই পাতা ভাতের সঙ্গে সেদ্ধ করে খাওয়া হয়। প্রজাতিটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে বনের ক্ষয় নিয়ন্ত্রণে মূল্যবান পরিবেশগত উপাদান হিসেবে কাজ করে। অরণ্য উচ্ছেদ ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে বর্তমানে গাছটি বিপন্ন।

হলদে রঙের দোলনচাঁপা

কোয়ান্টাম প্রাঙ্গণে বিরল উদ্ভিদের সংগ্রহশালায় এই ফুল দেখলাম। আগে কোথাও দেখিনি। দোলনচাঁপা আমাদের দেশে সহজলভ্য হলেও এর নিকটাত্মীয়া এখানে রোপিত হয়েছে। বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নাম হতে পারে হলদে দোলনচাঁপা। গাছের উচ্চতা, পাতা ও মঞ্জরি দোলনচাঁপার মতো, শুধু ফুলের রঙ হলুদ। ২০২২ সালে প্রকৃতিপ্রেমী সাইফুদ্দিন সাইফ এখানে রোপণ করেন গাছটি। কন্দজ এই গাছ হিমালয় অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে, আমাদের দেশে আগে ছিল না। পূর্ব হিমালয়ে ১২০০ থেকে ২০০০ মিটার উচ্চতায় পাওয়া যায়। ইংরেজিতে ‘ক্রিম গারলেন্ড লিলি’ বা ‘ইয়েলো জিনজার’ নামে পরিচিত।

কন্দজ ও পাতাযুক্ত কাণ্ডের এই গাছ (Hedychium flavescens) বহুবর্ষজীবী, দেড় থেকে দুই মিটার লম্বা। কন্দ তিন সেন্টিমিটার ব্যাস, শাখাযুক্ত, অভ্যন্তরীণভাবে ফ্যাকাশে ও সুগন্ধযুক্ত। পাতা আয়তাকার থেকে বর্শা আকৃতির, ২০ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার লম্বা। ফুল সুগন্ধি ও হলুদ। ফুলের নল সরু, ৮ থেকে ৯ সেন্টিমিটার লম্বা, পাপড়ি রৈখিক, বর্শা আকৃতির, ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার লম্বা। ঠোঁট প্রায়ই কেন্দ্রীয়ভাবে গাঢ় হলুদ। পুংকেশর হলুদ, ঠোঁটের প্রায় সমান লম্বা। ফুল ফোটার প্রধান মৌসুম জুলাই থেকে অক্টোবর মাস। এই গাছ হিমালয় ছাড়াও উত্তর ভিয়েতনাম, দক্ষিণ আফ্রিকা, মাদাগাস্কার, মরিশাস, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। নিউজিল্যান্ডে এই গাছ আগ্রাসী প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত হয়।