ঠাকুরগাঁওয়ে জেলা প্রশাসন ‘নো ফুয়েল কার্ড, নো পেট্রল-অকটেন’ নীতি চালু করেছে। এখন থেকে ফুয়েল কার্ড দেখাতে হবে পেট্রলপাম্পে জ্বালানি তেল নিতে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আগামী ৫ এপ্রিল থেকে জেলায় সব মোটরসাইকেলের মালিক-চালকদের এই নিয়ম মানতে হবে। ফুয়েল কার্ড পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
জেলায় জ্বালানি তেলের সংকট তীব্রতর হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মোটরসাইকেল চালকরা তেল পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতি সামলাতে জেলা প্রশাসন সাতটি শর্ত আরোপ করেছে। তারা মোটরসাইকেল চালকদের ফুয়েল কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তমতো, স্থায়ী ঠিকানার সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়, থানা বা পৌরসভা থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র, মোটরসাইকেলের নিবন্ধনপত্র ও চালকের লাইসেন্স দেখিয়ে ফুয়েল কার্ড নিতে হবে। যারা কাজের সূত্রে জেলা শহরে থাকেন, তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন।
চালকরা আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ফুয়েল কার্ড নিতে পারবেন। ৫ এপ্রিল থেকে কার্ড ছাড়া কেউ জ্বালানি পাবেন না। গতকাল সোমবার সকাল ১০টা থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, পৌরসভা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একসঙ্গে কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছে। বেলা ১১টায় পৌরসভায় গিয়ে দেখা গেছে, ফুয়েল কার্ডের জন্য মোটরসাইকেল চালকরা ভিড় করেছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের জগন্নাথপুরের হিমাদ্রী হিমাগারে চাকরি করেন এনামুল হক। কাজের জন্য তাঁকে গ্রামে গ্রামে ঘুরতে হয়। জ্বালানি সংকটে তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। দুপুর ১২টায় পৌরসভা কার্যালয়ের লাইনে তাঁকে দেখা যায়। তিনি বললেন, “দেড় ঘণ্টা হয়ে গেল লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এ সময়টুকুতে কেবল ১০ ফুট এগোতে পেরেছি। কখন যে আমার পালা আসবে, বলতে পারছি না।”
ব্যবসায়ী মকছেদুল হককে ব্যবসার জন্য ছুটতে হয়। তিনি বলেন, “সকাল সাড়ে নয়টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে। তিন ঘণ্টায় কয়েক পা সামনে যেতে পেরেছি। কার্ড দেওয়ার কাজ খুব ধীরে চলছে।” বেলা একটায় হাতে কার্ড নিয়ে ফিরে এলেন তিনি, মুখে বিজয়ের হাসি। তার কার্ডে লেখা, কার্ড দেখিয়ে একজন গ্রাহক তিন দিনের জন্য ৫ লিটার, সাত দিনের জন্য ১০ লিটার, ১২ দিনের জন্য ১৫ লিটার তেল নিতে পারবেন। প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষ পরিমাণ ও মেয়াদ পরিবর্তন করতে পারবেন।
এক বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা মো. আলী চার ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করছেন। তিনি বললেন, “আমার সামনে এখনো আরও জনাবিশেক মানুষ আছে। বুথের সংখ্যা বাড়ালে দ্রুত কার্ড বিতরণ করা যেত।” ফুয়েল কার্ডের লাইনে ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। তাঁর বাড়ি রংপুর, কর্মসূত্রে ঠাকুরগাঁওয়ে থাকেন। তিন ঘণ্টা দাঁড়ানোর পর জানতে পারেন, অন্য জেলার লোকদের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে কার্ড নিতে হবে। হতাশ তিনি বললেন, “কষ্টটাই জাই গেল।”
পৌরসভার কর নির্ধারক আবদুর রশিদ জানান, “সকাল ১০টা থেকে ফুয়েল কার্ড বিতরণ শুরু করেছি। বেলা দেড়টা পর্যন্ত ৫০টি কার্ড বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে।” পৌরসভায় তদারকি করছেন সদর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুর রহমান। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত ৫০০ কার্ড পেয়েছি। সব কাগজপত্র যাচাই করে ফুয়েল কার্ড বিতরণ করতে একটু সময় লাগছে। পরবর্তী কষ্ট লাঘবে এই কষ্টটা মেনে নিতে হবে। বুথ বাড়ানোর প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
বেলা দেড়টায় সদর উপজেলার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ে লাইন চত্বর ছাড়িয়ে সোনালী ব্যাংকে পৌঁছেছে। সেখানে পুরাতন ব্যবসায়ী মাজেদুল হক বললেন, “এক পা আগাতে অনেক সময় লাগছে। শেষ পর্যন্ত কার্ড পাব কি না, জানি না। না পেলে কষ্ট করে আরেক দিন আসতে হবে।” জগন্নাথপুরের দুর্লভ রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি এক কোম্পানির বিপণন বিভাগে চাকরি করেন। তিনি বললেন, “রাত হলেও ফুয়েল কার্ড নিয়েই বাড়ি ফিরব। ফুয়েল কার্ড মোর লাগিবেই।”
জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, ফুয়েল কার্ড বিতরণের পরে জানা যাবে কতজন ফুয়েল কার্ডের আওতায় এলেন। আগামী ৫ এপ্রিল থেকে এই কার্ড ছাড়া কোনো মোটরসাইকেলচালক ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারবেন না। জেলায় সব নিবন্ধনবিহীন ও অবৈধ যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। অবৈধ যানগুলো চলাচল বন্ধ করতে পারলেই, বৈধ যানের চালকেরা চাহিদামতো জ্বালানি তেল সহজেই পাবেন। ফুয়েল কার্ড বিতরণের বুথ বাড়ানোর বিষয়টি ভেবে দেখবেন বলে জানান জেলা প্রশাসক।






