খাগড়াছড়ির প্রায় চার হাজার ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলচালক পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না। এর ফলে অনেকের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। জেলার ৯টি উপজেলায় মোটরসাইকেল একটি প্রধান পরিবহনমাধ্যম। স্থানীয়ভাবে এই চালকদের 'বাইকচালক' বলে ডাকা হয়। যাত্রী বহন করতে না পেরে তারা সংসার চালানোয় হিমশিম খাচ্ছেন।

‘গার্মেন্টসে চাকরি করে আর মায়ের সোনার কানের দুল বিক্রি করে মোটরসাইকেলটা কিনেছিলাম। এই মোটরসাইকেলই ছিল আমাদের পরিবারের ভরসা। তেল না থাকায় এখন আর মোটরসাইকেল চালাতে পারছি না। এভাবে চললে কয়েক দিন পর পথে বসা ছাড়া আর উপায় থাকবে না।’

এ কথা বলছিলেন খাগড়াছড়ির পানছড়ির বাসিন্দা কৌশিক ত্রিপুরা। প্রায় এক যুগ ধরে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে তিনি সংসার চালিয়ে আসছেন। আগে প্রতিদিন তাঁর ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় হতো। কিন্তু তেলের সংকটে সম্প্রতি এ আয় প্রায় বন্ধ। এখন জীবিকা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন।

শুধু কৌশিক নয়, তাঁর মতো অন্তত চার হাজার চালক একই দুর্দশায়। জেলার ৯টি উপজেলার বিভিন্ন সড়কে তারা মোটরসাইকেলে যাত্রী বহন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। অনেকের জন্য এটাই পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস।

গতকাল সোমবার জেলা শহরের কয়েকজন মোটরসাইকেলচালকের সঙ্গে জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে কথা হয়। তারা জানান, জেলার সব ফিলিং স্টেশনে তেলের অভাব। বেশিরভাগ স্টেশন বন্ধ। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পাওয়া গেলেও তা যথেষ্ট নয়। ফলে অনেকে দিনমজুরির কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।

পানছড়ি এলাকার আরেক চালক মো. রহমান বলেন, ‘ভোরে গিয়ে পাম্পে লাইনে দাঁড়াই। তিন-চার ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও তেল পাই না। কখনো যদি পাইও, তখন ১০০ বা ২০০ টাকার বেশি দেয় না। এই তেল দিয়ে সারা দিন চালানো সম্ভব নয়। এ কারণে আয়ও কমেছে।’

‘জেলায় ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের চার-পাঁচ হাজার চালক রয়েছেন। তেলের সংকটে প্রায় সবাই কাজ হারিয়েছেন। কেউ দিনমজুর, কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন। সরকার যদি দ্রুত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না করে, তাহলে এই অঞ্চলের হাজারো পরিবার সংকটে পড়বে।’

আবদুর রহমান সুমন, সভাপতি, মোটরসাইকেল মালিক সমিতি

মাটিরাঙ্গার চালক অগ্যজাই মারমা বলেন, ‘আগে প্রতিদিন যা আয় করতাম, এখন তার অর্ধেকও হয় না। অনেক দিন তো আয়ই হয় না। বাধ্য হয়ে অন্যের জমিতে কাজ করছি। দিনমজুরির কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছি।’ একই অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন জয়নাল আবেদিন। দুই সন্তানের বাবা তিনি। বলেন, ‘মোটরসাইকেল চালিয়েই দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতাম। এখন তেল না থাকায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে। কিছুদিন রাজমিস্ত্রির কাজ করছি; কিন্তু এই কাজ নিয়মিত পাওয়া যায় না। সব মিলিয়ে সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে গেছে।’

মোটরসাইকেল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রহমান সুমন বলেন, জেলায় ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের চার-পাঁচ হাজার চালক রয়েছেন। তেলের সংকটে প্রায় সবাই কাজ হারিয়েছেন। কেউ দিনমজুর, কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন। সরকার যদি দ্রুত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না করে, তাহলে এই অঞ্চলের হাজারো পরিবার সংকটে পড়বে।

তবে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, জেলায় প্রকৃতপক্ষে তেলের সংকট নেই। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মজুত রেখে তেল বিক্রি না করা ও কিছু ভোক্তা বারবার তেল নেওয়ায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। প্রশাসন বিষয়টি নজরদারিতে রেখেছে। অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।