জানুয়ারি মাসে আলভারো আরবেলোয়া রিয়াল মাদ্রিদের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা ছিল একেবারে অপ্রত্যাশিত। বিদায়ী কোচ জাবি আলোনসোর তুলনায় তিনি তখন অপরিচিত নাম ছিলেন। সমর্থকরা প্রথমে তাঁকে আপৎকালীন বিকল্প মনে করলেও, এখন তিনিই হয়ে উঠেছেন দলের ভরসার প্রতীক।

দায়িত্ব নেওয়ার সময় আরবেলোয়ার জন্য দলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মতো সময় ছিল না, কারণ টানা ম্যাচের চাপে ফলাফলের দিকেই নজর রাখতে হয়েছে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমগুলো সতর্ক করেছিল যে, একাধিক তারকাখচিত ড্রেসিংরুম সামলানো সহজ হবে না। কিন্তু সব আশঙ্কা অতিক্রম করে তিনি দলকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

রিয়ালের হাইপ্রোফাইল দল সামলানো নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আরবেলোয়া বলেছিলেন, “এটা আমাকে খুব চিন্তিত করে না।” দুই মাস পর তিনি জানান, খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী হয়েছে এবং মাঠের ফলাফলও উন্নত হচ্ছে। এমনকি আলোনসোর আমলে নিস্তেজ কিছু তারকাকেও তিনি উজ্জীবিত করেছেন। তাঁর প্রাথমিক সাফল্যের পেছনের কারণগুলো নিয়ে এই প্রতিবেদন।

মার্চ মাসে আরবেলোয়া রিয়ালকে জয় এনে দিয়েছেন জোসে মরিনিওর বেনফিকা, পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি এবং ডিয়েগো সিমিওনের আতলেতিকো মাদ্রিদের মতো শীর্ষ কোচদের দলের বিপক্ষে। লা লিগায় শীর্ষের বার্সেলোনার চেয়ে চার পয়েন্ট পিছিয়ে থাকলেও শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে রিয়ালের। চ্যাম্পিয়নস লিগেও তারা সঠিক পথে, কোয়ার্টার ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায়। আলোনসোর বিদায়ের পর থেকে ইতিবাচক ফলাফলের পেছনে কোচ-খেলোয়াড় সম্পর্কের উন্নতি বড় ভূমিকা রেখেছে।

গত সপ্তাহে নগরপ্রতিদ্বন্দ্বী আতলেতিকোর বিপক্ষে ৩-২ গোলে জয়ের পর আরবেলোয়া বলেন, “আমি খেলোয়াড়দের আরও ভালোভাবে চিনছি।” দায়িত্ব নেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি বলেছেন, “আমি এমন সময় দায়িত্ব নিয়েছিলাম, যখন প্রায় কোনো সময়ই পাইনি খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করার। এমনকি তারা কোথায় স্বস্তি বোধ করে এবং কীভাবে একে অপরের সংযোগ তৈরি করে, তাও বোঝার বিষয় ছিল।”

আরবেলোয়া স্বীকার করেন, মৌসুমের মাঝপথে দায়িত্ব নেওয়া সহজ ছিল না, “মাঝ-মৌসুমে এসে দল কীভাবে কাজ করে, তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ নয়, আর এ দুই মাসে সেটাই পরিবর্তিত হয়েছে। এখন আমি আমার খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত এবং পেশাদার দিক থেকে ভালোভাবে জানি, কোথা থেকে তাদের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স পাওয়া যাবে, আর কোথায় সমন্বয় করা দরকার, সেটাও বুঝি।”

আরবেলোয়ার অধীনে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র দারুণ ছন্দে ফিরেছেন। কোচ দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৭ ম্যাচে ১৬টিতে একাদশে ছিলেন তিনি এবং ১১ গোল করেছেন, যেখানে আলোনসোর আমলে ২৭ ম্যাচে মাত্র ৬ গোল। আরবেলোয়া ভিনির আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে কৌশলগত বাঁধন ছাড়া স্বাধীনভাবে খেলতে উৎসাহ দিয়েছেন। প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, “ভিনিকে পেয়ে আমি ভাগ্যবান। সমর্থকদের কাছেও সে খুব প্রিয়। আমরা এমন ভিনিকেই দেখতে চাই, যে খেলা উপভোগ করে, হাসে, নাচে।” আলোনসোর আমলে দুজনের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল, ক্লাসিকোতে বদলির পর ভিনি বলেছিলেন, “আমি এই দল ছেড়ে চলে যাব।” কিন্তু এখন সব বদলে গেছে।

আরবেলোয়ার আমলে ফেদে ভালভের্দেও চমৎকার ফর্মে। আলোনসোর অধীনে ৩১ ম্যাচে ৩ গোল ও ৭ গোল অ্যাসিস্টের বিপরীতে আরবেলোয়ার ১৭ ম্যাচে ৭ গোল ও ৫ অ্যাসিস্ট। পজিশন পরিবর্তন এর মূল কারণ—তাঁকে মিডফিল্ডে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আলোনসোর আমলে চোটের কারণে দানি কারভাহাল ও ট্রেন্ট আলেকজান্ডার আরনল্ডের অনুপস্থিতিতে ভালভের্দেকে রাইট-ব্যাকে খেলাতে হয়, যাতে তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন, “আমি রাইট-ব্যাক হওয়ার জন্য জন্মাইনি।” এখন পছন্দের পজিশনে এক মাসে ৬ গোল, যার মধ্যে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক ও আতলেতিকোর বিরুদ্ধে জয়সূচক গোল।

রিয়ালের মূল দলের আগে আরবেলোয়া ক্লাবের ‘কাস্তিয়া’ (বি) দলের কোচ ছিলেন। তাই তরুণদের মূল দলে আনা তাঁর স্বাভাবিক। চলতি মাসের শুরুতে এলচের বিপক্ষে ‘কাস্তিয়া’র ছয় খেলোয়াড়কে সুযোগ দেন—গনসালো গার্সিয়া, দানিয়েল ইয়ানেজ, দিয়েগো আগুয়াদো, মানুয়েল অ্যাঞ্জেল, সেজার পালাসিওস বদলি হিসেবে এবং থিয়াগো পিতার্চ একাদশে।

পিতার্চ দ্রুত নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ১৮ বছর ২২৬ দিন বয়সে ক্লাবের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগ নকআউটে দুবার শুরুর একাদশে নামেন। এক ম্যাচে পাঁচ একাডেমি খেলোয়াড় দেখে আরবেলোয়া বলেন, “আজকের মতো একটি রাতের পর আমি নিশ্চিন্তে মরতেও পারি।”

এটা আরবেলোয়া যুগের শুরু মাত্র। সামনে তিনি দলকে নিয়ে আর কী চমক দেখান, তা দেখার অপেক্ষা।